আজ ২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বই দিবস। প্যারিসে ১৯৯৫ সালে ইউনেসকোর সাধারণ সভায় দিনটিকে বই দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। বই পড়া, মুদ্রণ, কপিরাইট সংরক্ষণ ও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য। ‘বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস’ নামেও এটি পরিচিত। ধারণাটি প্রথম আসে স্পেনীয় লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেসের কাছ থেকে, যিনি ১৯২৩ সালের ২৩ এপ্রিল মিগেল দে সেরভান্তেসের স্মৃতিতে এই দিবস পালন শুরু করেন। সেরভান্তেস, উইলিয়াম শেক্সপীয়ার ও ইনকা গার্সিলাসো দে ভেগার প্রয়াণ দিবস ২৩ এপ্রিল হওয়ায় দিনটির তাৎপর্য আরও বাড়ে। বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের প্রথিতযশা নির্মাতা সত্যজিৎ রায়েরও আজ প্রয়াণ দিবস।
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাপটে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেন-জি, একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে বই পড়ে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। বইপ্রেমীরা অবশ্য সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই বচন মনে করিয়ে দেন, ‘বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না।’ এই তর্ক-বিতর্কের মধ্যে আজকের দিনে বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন ‘পালামৌ’ নিয়ে আলোচনা সমীচীন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই রচনাটি ১৮৮০ থেকে ১৮৮২ সালের মধ্যে রচনা করেন। এটি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ছয় কিস্তিতে প্রকাশিত হয়, তখন সঞ্জীবচন্দ্র প্রমথনাথ বসু ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন।
একটি চাকরির সূত্রে লেখককে পালামৌ যেতে হয়েছিল। প্রথমে সেনা কর্মকর্তার লেখা একটি প্রতিবেদনের সাথে বাস্তবের গরমিল দেখে তিনি বিস্তারিত লেখায় আগ্রহী ছিলেন না, বরং উপহাসই করেছিলেন। কিন্তু স্মৃতিমধুরতাই হয়তো তাকে দশ-বারো বছর পর কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর ভাষায়, ‘অদ্য যাহা ভালো লাগিতেছে না, দশ বৎসর পরে তাহার স্মৃতি ভালো লাগিবে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঞ্জীবচন্দ্রের প্রতিভার প্রশংসা করলেও তাঁর মধ্যে ‘গৃহিণীপনার’ অভাব দেখে আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন। রচনাটিতে বারংবার প্রসঙ্গ বদলকে তিনি ‘সৌষ্ঠবহানি’ বললেও ‘পালামৌ’ যে অসম্পূর্ণতার চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত, তাতে সন্দেহ নেই।
এই মুক্ত রচনায় প্রকৃতি বর্ণনার পাশাপাশি লেখকের স্বাদেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধও উজ্জ্বল। ভ্রমণপথে কুলির মুখে ‘সাহেব’ সম্বোধন শুনে তিনি চিৎকার করে জানিয়েছিলেন, ‘আমি সাহেব নই, আমি বাঙালি।’ কোল জাতিসত্তার অধিবাসী অধ্যুষিত সেই এলাকার সামাজিক চিত্র, হাসি-আনন্দ, বিবাহ পদ্ধতি এবং বিশেষ করে হিন্দু মহাজনের ঋণের দায়ে দাসে পরিণত হওয়ার করুণ কাহিনী তিনি গভীর মমত্বে এঁকেছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ‘বনেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ আজও সর্বত্র উচ্চারিত হয়। ভ্রমণকাহিনী না উপন্যাস, কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলা না গেলেও, এই মুক্তগদ্য রচনা প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি সঞ্জীবচন্দ্রের গভীর প্রেমকেই উজ্জ্বল করে তুলেছে। চৌদ্দ দশক ছাপিয়েও ‘পালামৌ’র সে জৌলুশ এতটুকু ম্লান হয়নি।



