রাজধানীর মিরপুর কলেজের সীমানাপ্রাচীরের একাংশ ধসে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় উঠে এসেছে নির্মাণগত ত্রুটি এবং সংস্কার কাজে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি। কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রাণহানির এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত যদি সময়মতো সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হতো।
কলেজের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মূল সীমানাপ্রাচীরটি নির্মাণেই ছিল মারাত্মক কারিগরি ঘাটতি। প্রাথমিকভাবে কলেজের চতুর্দিকে তিন থেকে চার ফুট উঁচু ইটের গাঁথুনি ছিল, যার ওপরের অংশে ছিল লোহার অ্যাঙ্গেলের তৈরি গ্রিল। ২০১৪ সালে তদানীন্তন অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুর সময়কালে ওই গ্রিল সরিয়ে পুরোনো দেয়ালের গায়ে নতুন করে ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্রাচীরটির উচ্চতা বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু এই নির্মাণ কাজে কোনো রড-কংক্রিটের কলাম ব্যবহার করা হয়নি, যা একটি গুরুতর ত্রুটি ছিল। প্রায় এক দশক ধরে দুর্বল এই কাঠামোর ওপরেই টিকে ছিল পুরো দেয়াল।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইফফাত আজমী জানান, প্রাচীর নির্মাণের সময়কার দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল, যা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয় এবং ২০২১ সালের আগস্টে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ঘটনার আগেই দেয়ালটির ঝুঁকি উপলব্ধি করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এইচ এম মাহবুবুর রহমান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন। পাশাপাশি, স্থানীয় সংসদ সদস্য আগা খান মিন্টুও একটি ডিও চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ‘সীমানাপ্রাচীর, গেট নির্মাণসহ অভ্যন্তরীণ রাস্তা মেরামত ও সংস্কার’ খাতে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করে। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হলেও কাজ শুরু হয়নি বলে দাবি কলেজ কর্তৃপক্ষের।
তবে এ প্রসঙ্গে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ২০২২-এর বরাদ্দটি ছিল মূলত প্রধান ফটক নির্মাণের জন্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই কাজে অতিরিক্ত বরাদ্দ যোগ করে একটি সম্মিলিত ব্যয়-প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলমান ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেয়ালধসের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের আগেই ঘটনাস্থলে আসেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। মনজুরুল আলম আরও জানান, পুরনো দেয়ালের কোনো অংশ মেরামত না করে সম্পূর্ণটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য পৃথক বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ধসে পড়া অংশের পার্শ্ববর্তী আরেকটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে অস্থায়ী টিনের বেড়া স্থাপন করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের নিত্যপণ্য ক্রয়ের জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ওপর হঠাৎই দেয়ালটির একাংশ ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নাসিমা বেগম ও মো. ফিরোজ গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। একই ঘটনায় আহত বিউটি বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে নয়জন আহত ব্যক্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এবং তারা সকলেই শঙ্কামুক্ত বলে মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন। ঘটনার পরবর্তী সময়ে গতকাল রাত পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
উল্লেখ্য, হতাহতের এ ঘটনার একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে ট্রাক সেলটিকে ভুলক্রমে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী যাচাইয়ে দেখা যায় সেটি খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএস কর্মসূচির ছিল, যা সংশ্লিষ্ট এলাকা রেশনিং কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। অনাকাঙ্খিত এই ত্রুটির জন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।




