যুদ্ধক্ষেত্রের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্পর্শে বদলে যাচ্ছে। আকাশে ড্রোনের আধিপত্যের পর এবার মাটিতেও নেমে এসেছে চালকবিহীন রোবট গাড়ি। ইউক্রেনের কাদামাটি আর বারুদের গন্ধের মধ্যে ছুটে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধযান। ফরটেরা নামের মার্কিন স্বয়ংক্রিয় যানবাহন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের তৈরি শতাধিক সেলফ-ড্রাইভিং এটিভি গত ৯ মাস ধরে ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। মার্কিন বাহিনীর তৈরি চালকবিহীন স্থলযানের এমন বড় পরিসরে যুদ্ধে নামার ঘটনা এটাই প্রথম।

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যকারিতা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ছাড়া বোঝা যায় না বলে মনে করেন ফরটেরার চিফ গ্রোথ অফিসার ও সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা স্কট স্যান্ডার্স। তাঁর মতে, কোনো প্রযুক্তি যুদ্ধের ময়দানে না নামা পর্যন্ত তার প্রকৃত ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ড্রোনের কারণে খোলা মাঠে সেনা বা রসদ সরবরাহ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে মাটিতে চলা চালকবিহীন যানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন ইউক্রেনের সমরবিদরা।

মার্কিন সেনাবাহিনীর স্বয়ংক্রিয় যান কর্মসূচির প্রধান সার্জেন্ট মেজর কোরি উইলকিন্স বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রকে বর্ণনা করে বলেন, ড্রোন, দূরপাল্লার কামান বা মর্টারের সামনে সৈন্যরা এখন অত্যন্ত অরক্ষিত। লুকিয়ে থাকার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা আর নেই। ইউক্রেন বাহিনী আগে থেকেই নিজস্ব কিছু ব্যাটারিচালিত ছোট স্থলযান ব্যবহার করছিল, যেগুলো সর্বোচ্চ ২৫০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম ছিল। তবে ফরটেরার ল্যান্সার যান এসেছে ভিন্ন মাত্রায়। মার্কিন অর্থায়নে আসা এই যানগুলো মূলত গ্যাসোলিনচালিত এবং পোলারিস এটিভির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে রয়েছে কাস্টম সেন্সর ও কম্পিউটিং সিস্টেম।

চালকবিহীন এসব যান একবারে ৭৫০ কেজি পর্যন্ত রসদ বা গোলাবারুদ বহন করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর এক সদস্য জানান, রসদ সরবরাহ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য বর্তমানে ইউক্রেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যান এটি। গত বছরের অক্টোবর থেকে ইউক্রেনে পৌঁছানোর পর চালকবিহীন গাড়িগুলো এ পর্যন্ত ১ হাজার ১০০টির বেশি অভিযান সম্পন্ন করেছে। সব মিলিয়ে ২ হাজার ৫০০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪০ পাউন্ড যুদ্ধসামগ্রী বহন করেছে রোবট গাড়িগুলো। অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে ৫২ জন আহত সেনাকেও উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে এসেছে এগুলো।

স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। বর্তমানে ইউক্রেনের সৈন্যরা গাড়িগুলোকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে না চালিয়ে দূর থেকে রিমোট বা টেলি-অপারেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন। কারণ যানগুলো নিজে থেকে পথ চলতে পারলেও হঠাৎ সামনে চলে আসা শত্রুকে চিনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ইউক্রেনের এক সেনা কর্মকর্তার মতে, এমন প্রযুক্তি প্রয়োজন যা শত্রুর সামনে থাকাকালীন সরাসরি হুমকি মোকাবিলা করতে পারবে, বর্তমান ব্যবস্থা এখনো তা করতে পারে না।

ফরটেরার চিফ ইনোভেশন কর্মকর্তা স্কট ফিলিপস নিজে ইউক্রেনের অপারেশন সেন্টারে গিয়ে যানগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি জানান, খুব কাছ থেকে দেখেছেন কোন কোন কাজগুলো এখনো মানুষকে ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে এবং কোথায় ডেটা পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ছে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা কোনো স্লাইড প্রেজেন্টেশন থেকে পাওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।