কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্নিহিত কার্যপ্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনও সীমিত। তবে সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের গবেষকরা এলএলএম-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ উপাদান উন্মোচন করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে জে-স্পেস বা জ্যাকোবিয়ান স্পেস। এটি মূলত একটি অভ্যন্তরীণ স্ক্র্যাচপ্যাড বা কার্যক্ষেত্র, যা মডেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
এই আবিষ্কারের জন্য গবেষকরা একটি বিশেষ গাণিতিক কৌশল ব্যবহার করেছেন, যাকে বলা হচ্ছে জ্যাকোবিয়ান লেন্স বা জে-লেন্স। উনিশ শতকের গণিতবিদ কার্ল গুস্তাভ জ্যাকব জ্যাকোবির নামানুসারে এই কৌশলের নামকরণ করা হয়েছে। জে-লেন্স ব্যবহার করে গবেষকরা এলএলএম-এর বিভিন্ন স্তরে থাকা সংখ্যামানের ভেক্টরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখতে পেয়েছেন যে একটি নির্দিষ্ট স্থান বা জে-স্পেসে বিভিন্ন টোকেনের (শব্দের সংখ্যামান) উপস্থিতি মডেলের চূড়ান্ত আউটপুট নির্ধারণ করে।
গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষায় দেখা গেছে, যখন ক্লদ (অ্যানথ্রপিকের এলএলএম) কে জাল বোনে এমন প্রাণীর পায়ের সংখ্যা জানতে চাওয়া হয়, তখন জে-স্পেসে ‘মাকড়সা’ টোকেনটি বিদ্যমান ছিল এবং মডেলটি ৮ সংখ্যাটি উত্তর দেয়। কিন্তু গবেষকরা যখন জে-লেন্স ব্যবহার করে জে-স্পেসের ‘মাকড়সা’ টোকেনটি সরিয়ে সেখানে ‘পিঁপড়া’ টোকেনটি বসিয়ে দেন, তখন মডেলের উত্তর পরিবর্তিত হয়ে ৬ হয়। এটি প্রমাণ করে যে জে-স্পেসের বিষয়বস্তুই মডেলের আউটপুটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এই আবিষ্কারের ফলে এলএলএম-এর উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা উদ্বেগও তৈরি হয়েছে, কারণ কোনো দুর্বৃত্ত এই জে-স্পেসের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে মডেলের আউটপুটকে নিজেদের অনুকূলে নিতে পারে। অ্যানথ্রপিক নিউরনপিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ ডেমো তৈরি করেছে, যেখানে কিউয়েন ৩.৬ ২৭বি মডেল ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়াটি দেখা যাবে। এছাড়া জে-লেন্স কোড গিটহাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে অন্য গবেষকরাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন।
জে-স্পেস ও মানব মস্তিষ্কের গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস থিওরির (জিডব্লিউটি) মধ্যে সমান্তরাল টেনে অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চেতনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। অ্যানথ্রপিকের ব্লগ পোস্টেও জিডব্লিউটির সঙ্গে সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সতর্ক করে দিয়েছে যে তারা দাবি করছে না যে ভাষা মডেলগুলো মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস আর্কিটেকচার প্রতিলিপি করতে সক্ষম। নিউরোসায়েন্টিস্টরাও এই আবিষ্কারকে এআই চেতনার প্রমাণ হিসেবে নিতে নারাজ। স্ট্যানিসলাস দেহেন, লিওনেল নাকাশ, প্যাট্রিক বাটলিন প্রমুখ বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যেও রয়েছে সংযমের বার্তা।
ফোর্বসের কলাম লেখকসহ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জে-স্পেস আবিষ্কার আগামী দিনে এআই বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু একে চেতনার আসন বলে চিহ্নিত করা এখনই সম্ভব নয়। বরং এই অগ্রগতিকে মানব মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি বোঝার জন্য একটি নতুন দৃষ্টিকোণ হিসেবে দেখা উচিত, যা ভবিষ্যতে আরও গবেষণার পথ খুলে দেবে।




