রাজধানীর প্রতিটি সড়ক ও গলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার উপস্থিতি এখন নিত্যদিনের চিত্র। যানজট কমাতে ও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে স্থানীয় সরকার বিভাগ সম্প্রতি একটি খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে, যেখানে ঢাকাকে আটটি ভিন্ন রঙের জোনে ভাগ করে রিকশা পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। সেইসঙ্গে জিপিএস-নির্ভর জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, চালকদের জন্য ফিটনেস সনদ এবং সৌরবিদ্যুতে চার্জের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে বেশ কিছু কারিগরি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর, যা সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য প্রকৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর অটোমোবাইল বিভাগ যৌথভাবে রিকশার ফিটনেস সনদ প্রদান ও নবায়নের দায়িত্বে থাকবে। বিদ্যমান থ্রি-হুইলারগুলোর উচ্চগতি ও দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বাঁক নেওয়ার সময় সেন্ট্রিফুগাল ফোর্সের প্রভাবে এগুলো প্রায়ই উল্টে যায়। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বডি স্ট্রাকচার, এক্সেল লোড ও ভারসাম্যের মান যাচাই করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। পাশাপাশি মূল সড়কগুলো থেকে এসব ধীরগতির বাহন সরিয়ে অলিগলিতে সীমাবদ্ধ রাখলে ট্রাফিক ক্যাপাসিটিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

তবে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তিনটি বড় প্রযুক্তিগত বাধা সামনে এসেছে। প্রথমত, ঢাকার বহুতল ভবনঘন এলাকায় স্যাটেলাইট জিপিএস সিগন্যালে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে, যার ফলে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ নাও করতে পারে। দ্বিতীয়ত, যাত্রীদের দৈনিক ভ্রমণ কোনো প্রশাসনিক জোনের সীমানা মেনে চলে না। আন্তঃজোন যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে সময় ও খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, ২০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ার ব্যাটারি চার্জ করতে সাধারণ ৫০ ওয়াটের সোলার প্যানেল যথেষ্ট নয়। কেন্দ্রীয় হাইব্রিড সোলার পাওয়ার হাব স্থাপন না করে গ্যারেজ মালিকদের ওপর সোলার প্যানেল বসানোর একক শর্ত আরোপ করলে তা কার্যকর হবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থ্রি-হুইলার ও মাইক্রো-মোবিলিটি নিয়ন্ত্রণে এরকম প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের জয়পুর ও দিল্লিতে ছয়টি রঙিন জোনে রিকশার চলাচল সীমিত করে লাস্ট মাইল কানেকটিভিটি উন্নত করা হয়েছে। লন্ডন ও চীনের কিছু শহরে জিও-ফেন্সিংয়ের সঙ্গে আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট মোটর-কাটঅফ প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোটরের গতি কমে যায়। ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে পুরো শহরে না গিয়ে ধানমন্ডি বা উত্তরার মতো পরিকল্পিত এলাকায় পাইলট প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মেগাওয়াট স্কেল চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও আইওটি সেন্সরের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রযুক্তি, প্রকৌশল জ্ঞান ও নগর-পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটলে ঢাকাবাসী একটি নিরাপদ ও যানজটমুক্ত শহরের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।