বরিশাল শহর তার জলাশয় ও সবুজ প্রকৃতির জন্য একসময় পরিচিত ছিল, কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন ধুঁকছে। নগরটিতে ২৪টি খাল থাকলেও বর্তমানে মাত্র চারটিতে পানিপ্রবাহ আছে—সাগরদী খাল, জেল খাল, আমানতগঞ্জ খাল ও মোহাম্মদপুর খাল। বাকি খালগুলোর মধ্যে ৭টির অস্তিত্বই নেই, আর ১৩টি প্রায় মৃত। ২০০২ সালে এম এ জলিল সড়ক নির্মাণের জন্য নবগ্রাম খাল ভরাট করে ফেলা হয়, যার ফলে বৃষ্টি হলেই সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নাপিতখালী, ভাটার, চাঁদমারী, ভেদুরিয়া, কলাডেমা, সাপানিয়া, কাশীপুর, সোলনা, ভাড়ানি, পুডিয়ার খাল, উত্তর নবগ্রাম সাগরদী, ঝোড়াখালী, তাজকাঠি, চৌপাশা ও শোভারানী—এসব খালের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।
শুধু খাল নয়, পুকুর ও দিঘির অবস্থাও সংকটজনক। ২০১১ সালের মহাপরিকল্পনা অনুসারে নগরে ৪৩৬টি সরকারি পুকুর ছিল, যা এখন ২০০-এর নিচে নেমেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন দেড় হাজার পুকুরের প্রায় সবই ভরাট করে বহুতল ভবন বানানো হয়েছে। সম্প্রতি কাউনিয়ার মনসাবাড়ি এলাকায় একটি পুকুর, হাসপাতাল রোডের মা ও শিশুকল্যাণকেন্দ্রের একটি জলাশয় ও কাশীপুরের সীতারামের দিঘি ভরাট করা হয়েছে। বরিশাল মডেল স্কুল ও কলেজ নির্মাণের সময় একটি বিশাল দিঘি ভরাট করা হয়, যার সঙ্গে নাপিতের খাল যুক্ত ছিল। লালার দিঘির একাংশ ভরাট করে প্লট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। বাপার বরিশাল সমন্বয়ক লিংকন বায়েন জানান, জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন আইনত সম্ভব নয়।
জলাশয় হারানোর ফলে বরিশালে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকায় পানি জমে, যা সহজে নামে না। কীর্তনখোলা নদীর জোয়ারের উচ্চতাও পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে। আমির কুটির এলাকার শামীমা আক্তার বলেন, বর্ষা এলে তাদের এলাকায় পানি জমে দুর্বস্থা হয়। বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সিটি করপোরেশন প্রতিদিন ২ কোটি ৪০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করলেও চাহিদা ৫ কোটি ২৬ লাখ লিটার। ঘাটতি পূরণে ব্যক্তিপর্যায়ে গভীর নলকূপ বসানোর সংখ্যা ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান তরফদার জানান, দুই দশক আগে ৭৮০ থেকে ৮২০ ফুট গভীরতায় সুপেয় পানি মিললেও এখন ৯৫০ ফুটের নিচে নামতে হচ্ছে।
তাপমাত্রা ও জলবায়ুতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. আবদুল্লাহ সালমানের গবেষণা অনুসারে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৬০ বছরে শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বৃষ্টিপাত কমেছে প্রতি বছর গড়ে ০.১৮ মিলিমিটার হারে। তিনি বলেন, বরিশাল দ্রুত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দিকে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল-পুকুর ভরাটের কারণে এই অবস্থা। ২০১১ সালে নেওয়া মহাপরিকল্পনার ২০৩০ সালের সময়সীমা শেষের দিকে এলেও অগ্রগতি সামান্য। নতুন করে নগর-সংলগ্ন অঞ্চল যুক্ত করে আয়তন বাড়িয়ে ১০৩ বর্গকিলোমিটার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো দূরে।
সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, শহরে আগে যে প্রাণ ছিল, এখন তা নেই। অন্য শহরের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও বর্তমান সম্পদকে যত্ন করে টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে খাল উদ্ধারের দাবি জানানো হলেও তা উপেক্ষিত। বেসরকারি সংস্থা ‘রান’-এর প্রধান নির্বাহী রফিকুল আলম বলেন, এই উদাসীনতা অব্যাহত থাকলে বরিশাল অচিরেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।




