ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোর মধ্যেই এমন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে যাবে, যা বর্তমান ক্রিপ্টোগ্রাফিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিতে সক্ষম। ফলে পুরো ডিজিটাল সম্পদ শিল্পকে সময় থাকতেই সতর্ক অবস্থান নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
কোয়ান্টাম-নিরাপদ ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক কুয়ান্টাসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফার স্মিথ বলেছেন, আসন্ন কোয়ান্টাম যুগের জন্য সমগ্র ডিজিটাল সম্পদ শিল্পকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য প্রক্রিয়া করে। যেখানে ঐতিহ্যবাহী কম্পিউটার ০ বা ১ বিট ব্যবহার করে এবং ট্রানজিস্টরের আকারের শারীরিক সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোয়ান্টাম বিট বা কিউবিটের মাধ্যমে হিসাব-নিকাশ চালায়। ফলে যে কোনো গণনা প্রচলিত প্রযুক্তির চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
এতদিন ধরে ডিজিটাল সম্পদের মালিকানা প্রমাণের ক্রিপ্টোগ্রাফি প্রায় অটুট বলে বিবেচিত হতো। কারণ প্রচলিত সুপারকম্পিউটার দিয়ে সেই গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে কয়েক শত মিলিয়ন বছর লেগে যেত। তবে পর্যাপ্ত শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হলে এই হিসাব সম্পূর্ণ বদলে যাবে বলে স্মিথ সতর্ক করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ডিজিটাল সম্পদ এলিপটিক কার্ভ ক্রিপ্টোগ্রাফির ওপর নির্ভরশীল, যা গত ৩০ বছর ধরেই কোয়ান্টাম-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। এই অঙ্ক পুরো ক্রিপ্টো বাজারের প্রায় সম্পূর্ণ মূল্যের সমান, যার বর্তমান আকার ২.১৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
কোয়ান্টাম হামলার আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে, কারণ গবেষণার গতি বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। গুগলের গবেষকদের ধারণা, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ব্যবহৃত এলিপটিক-কার্ভ ক্রিপ্টোগ্রাফি ভাঙতে প্রয়োজনীয় গণনাসামগ্রী আগের ধারণার চেয়ে কম হতে পারে। স্মিথ ও কুয়ান্টাসের মতে, একটি বিশাল বিটকয়েন ওয়ালেট কোয়ান্টাম হামলার জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে। তিনি বিনান্সের বিটকয়েন কোল্ড ওয়ালেটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জমা রয়েছে। আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে ইউএসডিটি নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনিক চাবি। এই চাবির অধীনে স্টেবলকয়েন ইস্যু করার ক্ষমতা থাকায় হামলাকারী পুরো ডিফাই সিস্টেমের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে এক মুহূর্তেই সব ধ্বংস করে দিতে পারে।
তবে সব ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমকে সমান ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছে কয়েনবেস। সংস্থাটি ফরচুনকে জানিয়েছে, বিটকয়েনের মূল পরিকাঠামো অনেকাংশে নিরাপদ, আসল দুর্বলতা ওয়ালেট স্তরে। প্রযুক্তিগত প্রতিস্থাপনের চেয়ে স্থানান্তর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়াই বেশি কঠিন। গুগল ২০২৯ সালের মধ্যে ক্রিপ্টো সিস্টেমগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রিপ্টোগ্রাফি থেকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য প্রস্তাব করেছে। মার্কিন জাতীয় মান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট (এনআইএসটি) ইতিমধ্যে পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গ্রহণে সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করছে এবং প্রতিস্থাপন অ্যালগরিদম প্রমিত করেছে।
ব্লকচেইনে কোয়ান্টাম-নিরাপদ স্বাক্ষর যোগ করা একটি সমাধানযোগ্য প্রকৌশল সমস্যা বলে মনে করে কয়েনবেস। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সময়মতো স্থানান্তর না করা মুদ্রাগুলোর কী হবে? কয়েনবেসের স্বাধীন কোয়ান্টাম উপদেষ্টা কাউন্সিল সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে কোয়ান্টাম স্থানান্তর ও পরিত্যক্ত মুদ্রা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্লকচেইন নিরাপত্তা কেবল কেন্দ্রীয় সেবার এনক্রিপশন আপডেট করার মতো নয়; ডেভেলপার, এক্সচেঞ্জ, ওয়ালেট প্রদানকারী এবং ব্যবহারকারী—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এক্সচেঞ্জ সমর্থন না করলে ব্যবহারকারীরা সম্পদ স্থানান্তর করতে পারবেন না; ওয়ালেট আপডেট না হলে ঝুঁকি থেকে যায়।
স্মিথের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্ষক প্রতিষ্ঠান, এক্সচেঞ্জ, মোবাইল ও হার্ডওয়্যার ওয়ালেট প্রদানকারী, ব্লকচেইন ডেভেলপার এবং সাধারণ ব্যবহারকারী—সবাইকে ডিজিটাল সম্পদ রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে। কয়েনবেসও স্বীকার করেছে, সমস্যা সমাধানে পুরো শিল্পের ঐক্যবদ্ধ সমন্বয় জরুরি। তারা বিটকয়েন সিকিউরিটি কনসোর্টিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যা ব্ল্যাকরক, ফিডেলিটি ডিজিটাল অ্যাসেটস, ব্লক, ব্লকস্ট্রিম ও স্ট্র্যাটেজিসহ বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিটকয়েন কোম্পানিগুলোর উদ্যোগে গঠিত। কোম্পানিটি কোয়ান্টাম নিরাপত্তায় কাজ করা বিটকয়েন ডেভেলপারদের জন্য তহবিলে অবদান রাখছে এবং বিআইপি-৩৬০ ও পোস্ট-কোয়ান্টাম স্থানান্তর পথের মতো উদ্যোগে প্রকৌশল সম্পদ ব্যয় করছে। পাশাপাশি ক্রিপ্টোতে কোয়ান্টাম ঝুঁকি নিয়ে একটি অবস্থানপত্র প্রকাশ করেছে এবং সম্ভাব্য আপগ্রেডে সমন্বয়ের জন্য ডেভেলপার ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছে।
তবে বাস্তবে কোয়ান্টাম হামলা চালাতে সক্ষম যন্ত্র তৈরি এখনো সম্ভব নয়। কিন্তু প্রস্তুত হওয়ার সময় এখনই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্মিথ বলেছেন, এক বছর আগে প্রস্তুতি নেওয়া এক দিন দেরি করার চেয়ে অনেক ভালো।




