কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কে চরমপন্থার প্রবণতা দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলু। এমআইটি-র এই বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান আলোচনাটি দুটি বিপরীত মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা অত্যন্ত অনুৎপাদনশীল। একদিকে রয়েছেন সেইসব মানুষ, যারা বিশ্বাস করেন এআই সবার জন্য নিঃশর্তভাবে কল্যাণকর হবে; অন্যদিকে আছেন সংশয়বাদীরা, যারা এআই-এর সক্ষমতাকে অস্বীকার করে একে কেবল একটি 'স্টোকাস্টিক প্যারট' বা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র হিসেবে দেখেন। অ্যাসেমোগলুর মতে, এই দুই চরমপন্থার বাইরে থেকে বাস্তবতাকে দেখা প্রয়োজন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, কোডিং, গাণিতিক প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআই প্রকৃত উন্নতি করছে, তবে একই সাথে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান হারানোর ভয়টি অত্যন্ত বাস্তব। এই পরস্পরবিরোধী দুটি ধারণাকে একসাথে গ্রহণ করার মানসিকতা বর্তমানে বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার নতুন বই 'What Happened to Liberal Democracy?'-তে অ্যাসেমোগলু দেখিয়েছেন যে, এআই বিতর্ক এবং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এক গভীর মিল রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে আমরা এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছি যেখানে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সবকিছুকে অতিরঞ্জিত বা চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, উদার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল 'যৌথ সমৃদ্ধি', যা উত্তর-শিল্পায়ন যুগে ভেঙে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এআই-এর ক্ষেত্রেও এই একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে; আমরা এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং এর ধ্বংসাত্মক সামাজিক প্রভাব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আলোচনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, এআই কিছু কাজে অসাধারণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি একেবারেই অবিশ্বস্ত। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোডিংয়ের বাইরে উৎপাদন খাত বা কাস্টমার সার্ভিসে এখনো এআই-এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যদি সমাজের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ কাজহীন ও আশাহীন হয়ে পড়ে, তবে একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজ টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। তাই তিনি 'শ্রমিক-বান্ধব এআই' (pro-worker AI)-এর কথা বলেছেন, যা কর্মীদের প্রতিস্থাপন করার বদলে তাদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করবে। এছাড়া বড় টেক কোম্পানিগুলোর একাধিপত্য সীমিত করা এবং কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
ড্যারন অ্যাসেমোগলু তার প্রাক্তন সহকর্মী স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এরিক ব্রিনজোলফসনের সাথে তার সম্পর্কের উদাহরণ টেনে বলেন, ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সম্মানজনক আলোচনা সম্ভব। তিনি মনে করেন, উদার গণতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট রেসিপি নয়, বরং এটি আলাপ-আলোচনা, সমঝোতা এবং জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করার একটি মডেল। বর্তমান সংকটময় সময়ে একে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সতর্ক করেছেন যে, এখনই এআই-এর দিক পরিবর্তন করা না হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে।




