গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এবার বিশ্বের ১১০টি দেশের নির্দিষ্ট কিছু আইফোন ব্যবহারকারীকে স্পাইওয়্যার হামলার সম্ভাবনার কথা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। ১৩ আগস্ট এসব ব্যবহারকারীকে ‘মার্সেনারি স্পাইওয়্যার’ বা ভাড়াটে স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা শনাক্ত হওয়ার পরই এ সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম ব্লিপিংকম্পিউটারকে প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করেছে যে, অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিকল্পিত এসব হামলার ঝুঁকি ধরা পড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া রেডিটের বেশ কয়েকজন ব্যবহারকারীও একই ধরনের বার্তা পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

২০২১ সাল থেকেই এই ধরনের উচ্চ-প্রোফাইল স্পাইওয়্যার হামলার আশঙ্কা থাকলে ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে আসছে অ্যাপল। তবে কোম্পানিটি কখনোই প্রকাশ করে না যে, কোনো নির্দিষ্ট সতর্কবার্তার সঙ্গে কোন স্পাইওয়্যার জড়িত। ফলে এবারের বার্তাগুলো ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপের কুখ্যাত পেগাসাস সফটওয়্যারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। যদিও মার্সেনারি স্পাইওয়্যারের উদাহরণ হিসেবে পেগাসাসের কথাই উল্লেখ করেছে অ্যাপল। অতীতে অ্যাপলের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ফরেনসিক তদন্তে কিছু ক্ষেত্রে পেগাসাসের সংক্রমণের প্রমাণও মিলেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টির বেশি দেশের ব্যবহারকারীদের এ ধরনের হুমকি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। সাধারণত সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিকরা এসব হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকেন। মার্সেনারি স্পাইওয়্যার দিয়ে হামলা চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল একটি প্রক্রিয়া, যা সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করেই চালানো হয়। অ্যাপলের মতে, একটি হামলায় লাখ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে এবং এর কার্যকারিতার সময়সীমাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত, যা শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তোলে।

বেশিরভাগ ব্যবহারকারী যে কখনোই এই ধরনের হামলার সম্মুখীন হবেন না, সেটিও জানিয়ে দিয়েছে অ্যাপল। তবে কেউ সতর্কবার্তা পেলে তা গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হামলার পেছনে কোনো সরকার, সংস্থা বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী জড়িত কি না, সে তথ্য প্রকাশ করা হয় না। মার্সেনারি স্পাইওয়্যার শনাক্ত করতে নিজস্ব হুমকি বিশ্লেষণ এবং তদন্তের ওপর নির্ভর করে অ্যাপল। তাই এই সতর্কবার্তাগুলোকে সাধারণ নিরাপত্তা পরামর্শ হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং এগুলো ‘উচ্চমাত্রার নির্ভরযোগ্যতার সতর্কবার্তা’ বলে অভিহিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যাপল স্বীকার করেছে, কোনো তদন্তই শতভাগ নিশ্চিত হতে পারে না, তবে সতর্কবার্তা পাঠানোর সময় তাদের আস্থা থাকে যে ব্যবহারকারীকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছে। সতর্কবার্তা প্রেরণের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে তারা, কারণ এতে হামলাকারীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে ভবিষ্যতে শনাক্তকরণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ব্লিপিংকম্পিউটারকে অ্যাপল জানিয়েছে, হুমকিসংক্রান্ত সতর্কবার্তা পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও হালনাগাদ করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখতে পারেন এবং নিজেদের ডিভাইস ও অ্যাকাউন্ট সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ ধরা পড়লে ব্যবহারকারীর অ্যাপল অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ই-মেইল ও ফোন নম্বরে আইমেসেজের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠায় অ্যাপল। ই-মেইল পাঠানো হয় notifications@email.apple.com ঠিকানা থেকে। তবে এ ধরনের সতর্কবার্তার নাম করে ভুয়া ই-মেইল ছড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। সতর্কবার্তাটি প্রকৃত কি না তা যাচাই করতে account.apple.com ওয়েবসাইটে লগইন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; সত্যিকারের সতর্কবার্তা থাকলে লগইন করলেই উপরে দেখা যাবে। প্রকৃত বার্তায় কখনোই লিংকে ক্লিক করতে, ফাইল খুলতে, অ্যাপ বা প্রোফাইল ইনস্টল করতে, অথবা পাসওয়ার্ড বা যাচাইকরণ কোড চাওয়া হয় না। এই ধরনের তথ্য চাওয়া হলে সেটি জাল বার্তা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

যারা মনে করেন তারা এই ধরনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, তাদের জন্য ‘লকডাউন মোড’ চালু করার পাশাপাশি ডিভাইসের সফটওয়্যার সর্বশেষ সংস্করণে আপডেট রাখা এবং প্রয়োজনে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে অ্যাপল।