প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মাছ ও মাংস দুটোই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান। তবে পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতার নিরিখে মাছ অনেক ক্ষেত্রে লাল মাংসের চেয়ে এগিয়ে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র পুষ্টি কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, মাছে উপস্থিত চর্বির বেশিরভাগই স্বাস্থ্যকর, অন্যদিকে লাল মাংসে খারাপ চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

গড়ে মাছে প্রায় ১০ শতাংশ চর্বি থাকে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ভালো চর্বি। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শুধুমাত্র মাছের মাধ্যমেই সরাসরি পাওয়া যায়। ইকোসাপ্যানটয়িক অ্যাসিড (ইপিএ) এবং ডোকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিড (ডিএইচএ)—এই দুটি উপাদান শিশুদের মস্তিষ্ক গঠনে এবং বয়স্কদের মস্তিষ্কের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত মাছ খান তাঁদের ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

মাছের স্বাস্থ্যকর চর্বি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (এলডিএল) ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে উপকারী কোলেস্টেরল (এইচডিএল) বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায়। এছাড়া এতে ফাইবারের পরিমাণ বেশি এবং সোডিয়াম কম থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য, কোলন ক্যানসার ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাছ রাখলে স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞ।

অন্যদিকে, লাল মাংসে গড়ে ২২ শতাংশ চর্বি থাকে, যার বড় অংশই স্যাচুরেটেড বা অস্বাস্থ্যকর চর্বি। অতিরিক্ত লাল মাংস গ্রহণ রক্তের কোলেস্টেরল ও এলডিএলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। লাল মাংসে ফাইবার কম থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য ও কোলন ক্যানসারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এতে উপস্থিত উচ্চ সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়িয়ে কার্ডিওভাসকুলার জটিলতা তৈরি করতে পারে। কিডনি জটিলতায় ভুগলে লাল মাংস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এটি রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়াতে পারে।

তবে সম্পূর্ণরূপে লাল মাংস বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে প্রচুর পরিমাণে জিংক, সেলেনিয়াম, আয়রন, ফসফরাস এবং বিভিন্ন বি ভিটামিন (বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২) পাওয়া যায়। যা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ ও হাড়-দাঁতের গঠনে সহায়ক। পুষ্টিবিদদের মতে, সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস খাওয়া গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে বয়স ৪৫-৫০ পেরোলে লাল মাংস গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।

সামগ্রিকভাবে, প্রোটিনের পাশাপাশি নানা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের সরবরাহকারী হিসেবে মাছ ও মাংস উভয়েরই গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিতে মাছকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে মত পুষ্টিবিশেষজ্ঞদের।