পর্তুগালের জনপ্রিয় পর্যটন শহর ফারো ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক লেখক তাঁর পরিবারের স্মৃতিচারণ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগালে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর, তবে স্ত্রী ও ছেলের পছন্দ ছিল অন্য। লিসবনে বসবাসরত বন্ধুর আমন্ত্রণে সুইডেনপ্রবাসী আরেক বন্ধু জাহিদের সঙ্গে গ্রীষ্মে যাওয়ার পরিকল্পনা হলেও শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসেন জাহিদ। ঠিক তখনই ১৮ বছর বয়সী ছেলে অনুভব জানায়, তার বন্ধুর কাছ থেকে ফারোর সৌন্দর্যের কথা শুনে সেখানে যেতে চায় সে। অনলাইনে খোঁজ করে হাঙ্গেরির বাজেট এয়ারলাইনস উইজ এয়ারে দুজনের রিটার্ন টিকিট মাত্র ৮০ পাউন্ডে পেয়ে যায় তারা। পরে স্ত্রীকে নিয়ে তিনজনের টিকিট কাটা হয় ১৩০ পাউন্ডে। বুকিং ডটকমে দুই বেডের একটি অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যায়, যেখানে সুইমিংপুলও আছে। তিন রাতের ভাড়া ১৬০ পাউন্ড। লন্ডন থেকে রান্না করা মুরগির মাংস আর ভাত-ডাল-মসলা সঙ্গে নেওয়া হয়, কারণ ভাত ছাড়া লেখকের চলে না। ছেলে অবশ্য জানিয়ে দেয়, সে বিদেশি খাবারই খাবে।
লন্ডনের গেটউইক এয়ারপোর্ট থেকে বেলা তিনটায় যাত্রা শুরু করে সন্ধ্যায় ফারো পৌঁছায় তারা। নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট পরে এয়ারপোর্টে আসে ট্যাক্সি। অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার সময় পিন নম্বর খুঁজে পেতে একটু বেগ পেতে হয়, পরে একজন আফ্রিকান হোটেল কর্মী সাহায্য করেন। রুমে ঢুকেই স্ত্রী তার পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে খুঁত ধরতে শুরু করলে বাপ-ছেলে দুজনই বিরক্ত হন। ফ্রেশ হয়ে পাশের শপিং মল থেকে পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাতে লন্ডন থেকে আনা তরকারি দিয়ে ভাত খান। তবে লন্ডন থেকে আনা চাল-ডাল রেস্টহাউসের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা না বুঝে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ায় আক্ষেপ থাকে। পরদিন সকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির কথা থাকলেও বাইরে চকচকে রোদ দেখা যায়। বারান্দায় বসে নাশতা করে তারা শহর ঘুরতে বের হন। রাস্তার ফুটপাত ছোট ছোট পাথরের টুকরো দিয়ে বানানো, যা অনেক জায়গায় অসমতল।
দুপুরে রেস্টহাউস থেকে বেরিয়ে পাউন্ড থেকে ইউরো বদলাতে 'বিডি মানি এক্সচেঞ্জ'-এ যান, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে চমকে যান। প্রতিষ্ঠানটি মূলত রেমিট্যান্স সেবা দেয়। কর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন শহরে একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ আছে—'বিডি কাবাব অ্যান্ড ক্যাফে'। পথে দুই বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা জানান, ফারোতে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি থাকেন এবং রেস্তোরাঁটি ওই পরিচিতদেরই একজন চালান। রেস্তোরাঁয় ঢুকে দুই বাংলাদেশি শেফের সঙ্গে গল্প জমে ওঠে। সেখানেই রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে দুপুরে একটি পর্তুগিজ রেস্তোরাঁয় মাছ খেতে যান। সি-বাছ মাছ শেষ থাকায় সি-ব্রম দিয়ে খাবার আসে, তবে অর্ডার করা এগ রাইসের বদলে ওমলেট দিয়ে ওয়েটার অবশেষে আলাদা ভাত পাঠায়। গ্রিল করা মাছ ভালো হলেও খাবারের দাম শুনে স্ত্রী আবারও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ছেলে জাপানি রেস্তোরাঁয় বুফে খেয়ে আসে, যেখানে ১৫ ইউরোতে যত খুশি খাওয়া যায়।
খাওয়া শেষে তারা ঐতিহাসিক ওল্ড টাউনে ঘুরতে যান, যেখানে নান্দনিক স্থাপত্য আর শপিংমল দেখে কিছু কাপড় কেনেন। সন্ধ্যায় ফিরে বাঙালি রেস্তোরাঁয় মোরগের তরকারি দিয়ে ভাত খান এবং মালিকের সৌজন্যে চা পান করেন। রেস্টহাউসে ফিরে দুই বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, পর্তুগালে লিগ্যাল হওয়া এখন আগের তুলনায় কঠিন হয়ে গেছে এবং আয়ও তুলনামূলক কম। পরদিন রেস্টহাউসের মালিক নিজে এসে বেসিনের গরম পানির সমস্যা সমাধান করে দেন। দুপুরে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় পরোটা, ডিমবাজি, ডাল ও চা খেয়ে দুইজনের বিল পড়ে ৭ ইউরো। ছেলে আলাদা পর্তুগিজ রেস্তোরাঁয় স্টেক খেতে গিয়ে ৫৫ ইউরো খরচ করে ফেলে। বিকেলে ফারো মেরিনায় গিয়ে পানির বিশাল জলরাশি দেখে লেখকের মনে হয় যেন সুনামগঞ্জের হাওরে দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা থাকলেও ছেলের বমি ভয়ের কারণে সেটি আর করা হয় না। মেরিনা থেকে উবারে শপিং সেন্টারে গিয়ে কেনাকাটা শেষে ফেরার পথে উবারচালক সিলেটের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন। পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় বিরিয়ানি না পেয়ে রাতে ছেলে পাশের ইয়েমেনি কাবাব শপ থেকে ডোনার কাবাব নিয়ে আসে। রাতে বাপ-ছেলে পোল খেলেন। ফেরার দিন সকালে সুপারস্টোর থেকে বিমানে খাওয়ার জন্য কিছু কেনা হয়। দুপুরে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় রুই মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে বিল আসে ২২ ইউরো, তবে ম্যানেজার ২০ ইউরো নেন। এরপর ট্যাক্সি নিয়ে সমুদ্রসৈকতে যান, তবে কক্সবাজারের তুলনায় সেটি তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি। ফেরার পথে টাঙ্গাইলের এক উবারচালকের সঙ্গে কথা হয়, যে অস্ট্রিয়ায় আইটি কাজ করে সম্প্রতি পর্তুগালে এসেছে। বিমানবন্দরে কফির দাম সাড়ে ৫ ইউরো শুনে স্ত্রী কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। ফারো এয়ারপোর্টে ১০০ মিলিলিটারের বেশি পানি নেওয়া নিষেধ থাকায় কেনা পানি ফেলে দিতে হয়। তিন ঘণ্টার বদলে আড়াই ঘণ্টায় গেটউইক এয়ারপোর্টে পৌঁছালে লন্ডনের ২ ডিগ্রি তাপমাত্রা পর্তুগালের ২৪ ডিগ্রি থেকে অনেকটাই পার্থক্য সৃষ্টি করে। ইমিগ্রেশনে লেখকের পাসপোর্ট বারবার স্ক্যান সমস্যায় আটকে যায়, যদিও তার স্ত্রী ও ছেলে ই-গেইট দিয়ে বেরিয়ে যায়। অফিসার হেসে বলেন, 'মোহাম্মদ' নামের কারণে হয়তো সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং নাম বদলে 'স্মিত' রাখার পরামর্শ দেন। লেখক মনে মনে বলেন, যত সমস্যাই থাকুক, তিনিই মোহাম্মদই থাকবেন।




