অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষিতে দেশের শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদানের বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত নিম্নমুখী এবং একইসঙ্গে দুটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মহেশখালীর সমুদ্রে ভাসমান এই দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট থাকলেও বর্তমানে একটি ইউনিট অকেজো হয়ে পড়ায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংকটের দরুন গত এক সপ্তাহ ধরেই সকল খাত গ্যাসের তীব্র সংকটে ভুগছে।
উল্লেখ্য, গ্যাসের অভাবে প্রায় অর্ধেকেরও বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু করা সম্ভব হচ্ছে না এবং সার কারখানাগুলোর সিংহভাগ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষকে নতুন সংযোগ দিলে তা গ্যাসের ঘাটতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং একটি এলাকায় সরবরাহ চালু করতে হলে অন্যএকটি এলাকা থেকে বন্ধ করার মতো অসম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, শিল্পে সংযোগ স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অস্থায়ী। গ্যাস সরবরাহ দ্রুতগতিতে বাড়ানোর জন্য সরকার একাধিক কৌশল পর্যালোচনা করছে। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনে ঢাকায় আনার প্রকল্প এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাঙ্কের মাধ্যমে এলএনজি পরিবহনের বিষয়কেও সক্রিয় আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পূর্বে অনুমোদন নিয়ে যারা ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধ করেছেন, তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া হবে।
তবে শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধের এ ঘটনা ইতিহাসে প্রথম নয়। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহক এবং পরবর্তীতে আবাসিক খাতেও নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল। তখন সংযোগ বরাদ্দের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কাজ করত, যার কার্যক্রম পরে দুর্নীতির অভিযোগে স্থগিত করা হয়। বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান বের হয়নি।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, এক দশক আগের তুলনায় দেশে গ্যাসের দৈনিক উত্তোলন ১০০ কোটি ঘনফুটের অধিক কমে গেছে। ২০১৭ সালে যেখানে দৈনিক উৎপাদন ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুট, সেখানে বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করতে পারে, তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আমদানি বৃদ্ধির পথ প্রায় রুদ্ধ। পাইপলাইনের সক্ষমতার কারণে মহেশখালীর আনোয়ারা স্টেশন থেকে পরবর্তী অংশে ১১০ কোটি ঘনফুটের অধিক গ্যাস পরিবহন সম্ভব নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, স্বল্প সময়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর একমাত্র উপায় আমদানি। অতিরিক্ত টার্মিনাল ও পাইপলাইন অবকাঠামো নির্মাণ না করলে সংকট নিরসন সম্ভব হবে না। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল করা সামিট ও এক্সিলারেটের সঙ্গে করা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তিকেসমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যেসব উদ্যোক্তা অনুমোদন পেয়ে ঋণ নিয়ে এবং ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সংযোগ না দিলে তারা আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারেন।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের ৪১ শতাংশ যায় বিদ্যুৎ খাতে এবং ৩৬ শতাংশ ব্যবহার হয় শিল্পে। গৃহস্থালি রান্নায় খরচ হয় মাত্র ১১ শতাংশ। বিদ্যমান প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো বাস্তবায়িত হলে আরও প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে, যার কোনোৎপাদন-আমদানি সংস্থান আপাতত নেই। জ্বালানি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ১০০টি কূপ খনন এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবানের পাশাপাশি নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রমও শুরু করেছে।




