দেশে পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল অংশই আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের বাইরে থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের ব্যাংকঋণসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত তথ্যে উঠে এসেছে, মোট এক কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেরই কোনো ধরনের নিবন্ধন নেই। সংখ্যার নিরিখে এসব অনিবন্ধিত ইউনিটের আধিক্য থাকলেও, জাতীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে নিবন্ধিত খাত।
বিবিএসের জরিপ বলছে, অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬ লাখ, যা মোট ইউনিটের ৬৫ শতাংশ। এর বিপরীতে, বিভিন্ন ধরণের বৈধ কাগজপত্রধারী নিবন্ধিত ইউনিটের সংখ্যা মাত্র ৩৩ লাখ বা ২৮ শতাংশ। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতাভুক্তই নয়। গত এক দশকের ব্যবধানে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রসার ঘটেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০১৩ সালে যেখানে প্রায় ৭৮ লাখ ইউনিটের সন্ধান মিলেছিল, সেখানে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধেকের বেশি।
শুমারির তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয়, নিবন্ধিত খাত আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মাত্র ২৮ শতাংশ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মোট ৫৪ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। বিপরীত চিত্রে, ৬৫ শতাংশ অনিবন্ধিত ইউনিটে কর্মরত মানুষের হার মাত্র ৩৭ শতাংশ। বিবিএস-এর পরিচালক মুহাম্মদ আতিকুল কবীর জানান, যাদের ট্রেড লাইসেন্স, বিআইএন বা অনুরূপ কোনো অনুমোদন আছে, তাদেরকেই নিবন্ধিত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক হয়েও যারা এগুলো গ্রহণ করেননি, তারা অনিবন্ধিত তালিকায় রয়েছেন।
অবস্থানগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ অঞ্চলেই অর্থনৈতিক ইউনিটের আধিক্য বেশি। দেশের প্রায় ৬৩ শতাংশ ইউনিটই গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। তবে কর্মী সংখ্যার দিক দিয়ে শহর ও গ্রামের অবস্থান অনেকটা কাছাকাছি। শহরের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আকারে বড় হওয়ার প্রতিটি ইউনিটে অধিক লোক নিয়োজিত। শহরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭ লাখ, যেখানে কাজ করছেন প্রায় ৯৯ লাখ মানুষ। অপরপক্ষে, গ্রামে ৫২ লাখ অনিবন্ধিত ইউনিটে মাত্র ৭৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, অনিবন্ধনের এই সংস্কৃতি দূর করতে ডিজিটাল সেবার দিকে জোর দিতে হবে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ মত প্রকাশ করেচেন, ট্রেড লাইসেন্সসহ সব অনুমোদন প্রক্রিয়া একটি ডিজিটাল 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' প্ল্যাটফর্মের অধীনে একত্র করতে হবে। এ ছাড়া নবীন উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে জামানতমুক্ত ঋণ, করছাড় ও কর ব্যবস্থাকে পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করাও জরুরি। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, ছোট উদ্যোক্তাদের ধারণা, নিবন্ধনের আওতায় এলে তাদের ব্যবসায়িক খরচ ও আনুষ্ঠানিকতার চাপ বেড়ে যাবে। তাই প্রথমেই সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং বিধি মানার চাপ ও খরচ কমানো জরুরি।




