সকাল, দুপুর ও রাত—প্রতিবেলায় একই খাবার, যেমন ধরুন পিৎজা, খেতে দেওয়া হলে কেমন অভিজ্ঞতা হবে? প্রাথমিক আনন্দ দ্রুতই ম্লান হয়ে যাবে যদি সেটিই সারা জীবনের একমাত্র খাদ্যতালিকায় পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, একটি মাত্র খাবারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতা মানবদেহের জন্য ধীরে ধীরে বিষক্রিয়ার সমতুল্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিশেষজ্ঞ ও ‘গাট ইনসাইট’ গ্রন্থের লেখক জো অ্যান হ্যাটনার এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কেউ যদি কেবল ভাত বা শুধু আম খেয়ে জীবনধারণের পরিকল্পনা করে, তবে সেটি হবে চরম ভুল। একটি নির্দিষ্ট ফল, সবজি কিংবা শস্যদানা খাওয়ার অর্থ হলো শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, শাকসবজি ও শর্করা বাদ দিয়ে শুধু মাংস খেতে থাকলে আরও জটিলতা তৈরি হয়। মাংস থেকে শক্তি নিষ্কাশনের জন্য শরীরের কার্বোহাইড্রেট প্রয়োজন, যা না পেলে শরীর বাধ্য হয়ে নিজের মাংসপেশিগুলো ভাঙতে শুরু করে—এ যেন নিজেকেই গ্রাস করার মতো এক আত্মধ্বংসী প্রক্রিয়া।
তা ছাড়া ফলমূল পরিহার করে যেকোনো একক খাদ্যে নির্ভরশীল হলে ভিটামিন সি-র তীব্র অভাব অনিবার্য। এই অভাবের ফলে স্কার্ভি নামক এক মারণ রোগ দেখা দেয়, যেখানে মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ হয় এবং দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৪০ সালের দিকে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে কিছু বন্দীর ওপর জোরপূর্বক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি-র অভাবে এক থেকে আট মাসের মধ্যেই স্কার্ভির উপসর্গ শুরু হয়। প্রাথমিক অবস্থায় শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে ও অস্থিতে তীব্র যন্ত্রণা হয়; পরবর্তী ধাপে সারা গায়ে পুঁজভর্তি ক্ষত, জন্ডিস ও উচ্চ জ্বর দেখা দেয় এবং শেষপর্যন্ত মাড়ি পচে দাঁত পড়ে গিয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটে।
পেশির গঠন ও সুস্থতা বজায় রাখার জন্য নয়টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড অপরিহার্য, কিন্তু একটি একক সবজি বা ডালজাতীয় খাবারে এই নয়টি উপাদান একত্রে মেলে না। প্রাচীনকালের মানুষ আধুনিক খাদ্যরসায়ন না জানলেও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কয়েক রকমের সবজি ও ডাল মিশিয়ে খেতেন—যেমন খিচুড়ি—যার ফলে শরীর সহজেই সব অ্যামিনো অ্যাসিড পেয়ে যেত।
আজ যদি কেউ জেদ করে কেবল এক রকমের সবজি খাওয়া চালিয়ে যায়, তবে অ্যামিনো অ্যাসিডের অভাব প্রথমে চুলের রং হালকা করে দেবে ও নখ নরম করে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতি হবে দেহের অভ্যন্তরে; শুধু হাত-পায়ের পেশিই নয়, হৃৎপিণ্ডসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে হৃৎপিণ্ড এতটাই সঙ্কুচিত হতে পারে যে জীবনহানি ঘটে। অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার রোগীরা যেমন খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেন, তাদের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায়। তেমনিভাবে, সবজি পরিহার করে কেবল রুটি বা পাস্তা খেয়ে বেঁচে থাকার চিন্তাও বিপর্যয় ডেকে আনে; অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতিতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে স্কার্ভির প্রকোপও দেখা দেয়।
জো অ্যান হ্যাটনার এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ একক-খাদ্য পরীক্ষার ব্যাপারে সরাসরি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আমি এই কাজ করার পরামর্শ ভুলেও কাউকে দেব না।’ তাই পুষ্টিবিদদের নিরেট উপদেশ হলো, সুস্থ, সবল ও চনমনে থাকতে হলে খাদ্যতালিকায় সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে—একটিমাত্র খাবারে বেঁচে থাকার চেষ্টা নিশ্চিত বিপর্যয়ের নামান্তর।




