বর্ষার মেঘমেদুর এক শুক্রবারে দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম হবিগঞ্জের বানিয়াচং ঘুরে দেখার স্বপ্ন পূরণ হলো। যেখানে সাধারণত কয়েকটি পাড়া মিলে একটি গ্রাম গঠিত হয়, সেখানে এই একটিমাত্র গ্রামকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চারটি ইউনিয়ন। এই গ্রামেই অবস্থিত সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের চেয়েও আয়তনে বড় লক্ষ্মীবাঁওড় জলাবন, যা স্থানীয়দের কাছে 'খড়তির জঙ্গল' নামেও পরিচিত। খড়তি নদের দক্ষিণে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত মিঠাপানির এই প্রাকৃতিক জলাভূমি ছাড়াও রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কমলা রানির দিঘি এবং ধ্বংসপ্রায় রাজপ্রাসাদ।
যাত্রা শুরু হয় হবিগঞ্জের আউশকান্দি থেকে নবীগঞ্জ হয়ে। সেখান থেকে জনপ্রতি ৬০ টাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে বানিয়াচং বড় বাজারে পৌঁছাই। স্থানীয়রা এই গ্রামকে 'বাইন্নাচং' নামে ডাকে। বাজারে হালকা নাশতা সেরে আদর্শ বাজারে গিয়ে নৌকা ভাড়া করা হয়। দরকষাকষির পর নৌকা লক্ষ্মীবাঁওড়ের দিকে রওনা দেয়। পথে বর্ষার পানিতে ভাসমান দ্বীপের মতো দেখতে কিছু গ্রামের বাসিন্দারা নৌকায় ওঠেন। তাদের একজন হাওরের টাটকা ছোট মাছ কিনেছিলেন মাত্র ৫০ টাকা কেজি দরে, যা এলাকার মাছের প্রাচুর্যের পরিচয় দেয়।
নৌকা ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। পানিতে বৃষ্টির শব্দ নৌকার ইঞ্জিনের শব্দকেও ডুবিয়ে দিচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর চোখে পড়ে থই থই পানি—যেখানে কিছুদিন আগেও ছিল ফসলের মাঠ, এখন সেখানে পানিতে ভাসছে লাল ও সাদা শাপলার পাতা, কলি ও ফল (ঢ্যাপ)। পানিতে ডোবা গাছের মধ্যে দিয়ে নৌকা চলার সময় শাপলা তোলার প্রতিযোগিতায় নামি আমরা। মাঝিরা দক্ষ হাতে ঢ্যাপ তুলে দেন। শাপলার কাণ্ড এত লম্বা যে আমাদের উচ্চতাও ছাড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে কচুরিপানার প্রাচীর নৌকার গতি কমিয়ে দেয়, তখন বাঁশের লগি দিয়ে পথ সরিয়ে নিতে হয়।
জলাবনের গভীরে প্রবেশ করতেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল ও করচগাছের সারি, ভেসে থাকা অদ্ভুত ডালপালা ও শিকড়—সব মিলিয়ে এক মায়াপুরী পরিবেশ। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চারপাশ। হিজল গাছে থোকা থোকা ফুল আর ফল। লাল হিজলের ফুলে ছেয়ে আছে পানির উপরিভাগ। কিছু গাছে এমন ফল ধরেছে যা দেখতে আতার মতো লাগে। গাছের গোড়ায় নৌকা ভেড়িয়ে ছবি তোলা হলো। জলাবনে আসা-যাওয়াসহ পুরো ভ্রমণে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। ফেরার পথে সদ্য তোলা ঢ্যাপ খাওয়া হলো—সাদা শাপলার ঢ্যাপের ভেতরের অংশ ধূসর, আর লাল শাপলার ঢ্যাপ লাল। তবে লাল শাপলার ঢ্যাপ কিছুটা তিতকুটে, তাই বাজারে সাদা শাপলার চাহিদা বেশি। ফিরতি পথে পানিতে ভাসা জেলেদের মাচাঘর, পানি ঘেরা দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রাম ও স্থানীয় মানুষের নৌকায় ছুটে চলা দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা ফিরে আসি।
লক্ষ্মীবাঁওড় থেকে ফিরে গোবিন্দ সিংহের রাজবাড়িতে যাই। ফটক পেরিয়ে সবুজ মাঠ, তার পাশে সারি সারি ফুল ও দেবদারু গাছ। রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ইটের গাঁথুনির পুরু দেয়াল, ছোট ছোট খুপরি, দেয়াল আঁকড়ে থাকা বটবৃক্ষ। এক অংশে ছনের ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘর, যা একসময় রাজার সালিস ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখন সেখানে ক্লাবঘরের নামফলক। সামনে শানবাঁধানো বিশাল পুকুর 'দেওয়ানদিঘি'। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি এই রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন তৎকালীন বানিয়াচং রাজা গোবিন্দ সিংহ ওরফে হাবিব খান। সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে ধর্মান্তরিত হয়ে তার নতুন নাম রাখা হয় হাবিব খান। তার বংশধর আনোয়ার খান বাংলার বারো ভূঁইয়াদের একজন হিসেবে মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।
সবশেষে আমরা যাই কমলা রানির দিঘিতে। প্রায় ৬৬ একর জুড়ে বিস্তৃত এই দিঘি স্থানীয়দের কাছে 'সাগর দিঘি' নামে পরিচিত। সামন্ত রাজা পদ্মনাভ প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে এটি খনন করেছিলেন। এই দিঘির পাড়ে বসেই পল্লীকবি জসীমউদদীন 'রাণী কমলাবতীর দিঘি' কবিতাটি লিখেছিলেন। লোককাহিনি অনুযায়ী, দিঘিতে পানি না উঠায় রাজা স্বপ্নে দেখেন, রানি কমলাবতী আত্মদান করলেই পানি আসবে। প্রজাদের কথা ভেবে রানি নিজেই আত্মাহুতি দিতে এগিয়ে যান এবং যত এগোন, পানি তত বাড়তে থাকে। একসময় তিনি সম্পূর্ণ ডুবে যান। এই করুণ লোকগাথার কারণেই দিঘিটি কমলা রানির দিঘি নামে পরিচিত।
দিঘির ঘাটে সন্ধ্যা নামে, সাথে বৃষ্টি। টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির শব্দ আর দিঘির পানিতে বৃষ্টি পড়ার শব্দ মিলে এক অপরূপ পরিবেশ তৈরি হয়। বৃষ্টির ছাঁটে হিমেল বাতাস ক্লান্তি দূর করে দেয়। যারা ঘুরতে যেতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ—রাজবাড়ি দেখতে শুক্র ও শনিবার সেরা, বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিনা টিকিটে খোলা থাকে। লক্ষ্মীবাঁওড় যেতে চাইলে শীতকালে যাওয়া ভালো, পানি শুকানোর আগে। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে হবিগঞ্জ আসা যায়; ট্রেনে আসতে চাইলে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে নেমে হবিগঞ্জ যেতে হবে। বানিয়াচংয়ে খাবারের দোকান থাকলেও আবাসিক হোটেল নেই, তাই থাকতে চাইলে হবিগঞ্জ শহরে ফিরে যেতে হবে।




