বৈশাখী কনসার্টে মেঘদলের ‘তবু মন’ গানটি যখন বেজে উঠছিল, পেছনের সারিতে বসে প্রথমবারের মতো ব্যান্ডটির প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মেছিল লেখকের। হেভি মেটাল-রক রুচির মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষটি দুই দশক পর নিজেকে মেঘদলের নতুন ভক্ত হিসেবে আবিষ্কার করলেন। ফেরার পথে কোরাসটি বারবার মুখে ফিরছিল—‘তবু মন তবু একলাই থাক...’। প্রশ্নটি তখনই উঁকি দেয়—মন কি সত্যিই সবসময় একা থাকে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্মোকি আইশ্যাডো আর ডার্ক রেড লিপস্টিক মানানসই কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার সময়ও তো কেউ সঙ্গে থাকে না। ফ্রয়েড-ফুকোর মন বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে রিলসের টোটকা, সবকিছু মিলিয়ে মনের জটিল রূপটি বারবার বদলাচ্ছে।

এখন তো সংসারের নতুন সদস্য এআই-এর কাছেও নিজের মন খুলে বলছে মানুষ। জেমিনাইকে জিজ্ঞেস করা হলো—বিজ্ঞান, দর্শন আর সাহিত্যের আলোকে মনের একটি সংজ্ঞা দিতে। তার উত্তর, ‘মন হলো জৈবিক মস্তিষ্কের আলোকশিখায় প্রজ্বালিত এমন এক অসীম আয়না...’। তবে এই রসহীন সংজ্ঞাটিই প্রমাণ করে, হাজার হাজার টন ডেটা খেয়ে বেড়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আসলে কোনো মন নেই। বুদ্ধ বলেছেন, মনই সব। লালন মনকে বোঝাতে রূপক শহরের কথা বলেছেন। শুভ্র দেব জানিয়ে দিয়েছেন সব ব্যথা সইতে পারবেন না। ধর্ম বলছে, মন এক দুরন্ত ঘোড়া, লাগাম না টানলে সে অন্ধকারে ডুব দেয়। সাহিত্যে মন চিরায়ত মসলা—ফাইট ক্লাব, গন গার্ল কিংবা দ্য সাইলেন্ট পেশেন্টের মতো বেস্টসেলার থ্রিলার থেকে শুরু করে হাজার বছরের কবিতা-গল্প, সবখানে মনের চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা চলেছে।

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘দ্য অডিসি’ সিনেমার উত্তেজনা এখনো কমেনি। বইয়ের দোকানেও অডিসির বিভিন্ন সংস্করণ নিয়ে পাঠকদের কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মহাকবি হোমারকে স্মরণ করা যেতেই পারে। হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর প্রথম খণ্ডেই এক তুঙ্গ মুহূর্ত। গ্রিক বীর একিলিস আর সেনাপতি আগামেমননের সংঘাত। আগামেমনন একিলিসকে ভরা মজলিসে অপমান করেন। নারীঘটিত অপমানে আহত হয় একিলিসের অহংকার। তরবারি খাপমুক্ত করে সে এগিয়ে যায়, কিন্তু দেবী এথেনা আকস্মিক উপস্থিত হয়ে তার চুল টেনে ধরেন। বাকি সবার অদৃশ্য দেবী একিলিসকে নিষেধ করেন খুনখারাবি করতে। একিলিস কোনো প্রশ্ন না করেই, বিনয়ী দাসের মতো দেবীর আদেশ পালন করে। চেতনা যেন তখন নেই বললেই চলে।

কিন্তু ‘দ্য অডিসি’-তে গল্প অন্য রকম। ট্রোজান যুদ্ধের পর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অডিসিয়াস নিজ রাজ্য ইথাকায় ফেরেন। ভিখারির ছদ্মবেশে নিজের প্রাসাদের বাইরে অবস্থান নেন। সেখানে দেখেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে অভিজাতদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়ছে, সবাই রাজকীয় সম্পদ দখলের চেষ্টা করছে। ক্রোধে বিস্ফারিত হয় তাঁর হৃদয়, প্রায় রক্তপাতের মুখে। কিন্তু ঠিক তখনই তাঁর মন তাকে থামতে বলে—ভিখারির বেশ প্রকাশ হয়ে গেলে রাজ্য পুনরুদ্ধার তো দূরের কথা, বিপদ আরও বাড়বে। নিজের ক্রোধকে সামলে নেন অডিসিয়াস। এখানে কোনো দেবী এথেনা নেই, কোনো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ নেই। নিজেই নিজেকে চালিত করেছেন তিনি। একিলিসের জন্য এথেনা থাকলেও অডিসিয়াসের জন্য ছিল শুধুই অডিসিয়াস।

হোমারের এই দুই মহাকাব্যকে ভিত্তি করে আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ জুলিয়ান জেনস ১৯৭৬ সালে উপস্থাপন করেন ‘বাইক্যামেরাল মাইন্ড’ তত্ত্ব। তাঁর বইয়ের শিরোনামেই এর নাম—‘দ্য অরিজিন অব কনসাশনেস ইন দি ব্রেকডাউন অব দি বাইক্যামেরাল মাইন্ড’। জেনসের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের আগে মানুষের তেমন আত্মসচেতনতা ছিল না। মস্তিষ্কের দুটি গোলার্ধ ছিল আলাদা দুটি কক্ষের মতো। সাধারণ কাজে বাঁ পাশের কক্ষ সংকেত দিত, আর জটিল সমস্যায় ডান পাশের কক্ষ দৈববাণী শোনাত—দেবতা, প্রেত বা ঈশ্বরের আদেশ হিসেবে। মানুষ সেই বাণী মেনে চলত। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষে সভ্যতার চাল বদলায়। যুদ্ধ, অভিবাসন, লিখনপদ্ধতি ও ভাষার প্রসার—সব মিলিয়ে মানুষের পুরোনো মস্তিষ্ক-কাঠামো আর ধোপে টিকল না। নতুন সংকট মোকাবিলায় মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতা ও যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করতে শিখল। এভাবেই ভেঙে পড়ে বাইক্যামেরাল মাইন্ড, আর জন্ম নেয় আত্মসচেতনতা।

জেনসের এই তত্ত্ব একাডেমিক জগতে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। পিউরিস্ট শাস্ত্রবিদ, বিজ্ঞানী আর দার্শনিকেরা তাকে কল্পনাবিলাসী বলে খারিজ করে দেন। বইটি জনপ্রিয়তা পেলেও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে আর পূর্ণ অধ্যাপকের পদ দেয়নি। তবে জেনস তাঁর তত্ত্ব থেকে সরে যাননি—১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত নিজের পক্ষে অবস্থান করেছেন। এই তত্ত্ব অবশ্য সাহিত্যজগতে বেশ প্রভাব ফেলেছে। ফিলিপ কে ডিকের ‘ভ্যালিস’-এ মানুষের মাথায় বাজতে থাকা দৈব আদেশের বিভ্রম ফুটে উঠেছে। নিল গেইম্যানের ‘আমেরিকান গডস’-এ দেখা যায়, মানুষের চেতনার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন দেব-দেবীরা ক্ষমতা হারাচ্ছে। প্রাচীন মানুষ দেবতার কণ্ঠস্বর নিজের ভেতর শুনতে পেত, কিন্তু মনের বিবর্তনে সেই ঐশ্বরিক চরিত্ররা চাকরি খুইয়েছে।

তত্ত্বের মূল ভিত্তি সাহিত্যকর্মের পাতায় ফিরে গেলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি প্রতিদিন অডিসিয়াসের জুতোয় পা রাখছি? আর আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা ছিলেন একিলিসের মতো? সেটাই হয়তো মনের সবচেয়ে বড় রহস্য।