আল্পসের কোলে অবস্থিত সুইজারল্যান্ডকে প্রকৃতির এক অপূর্ব উৎসবস্থল হিসেবে বর্ণনা করেছেন লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রাশিদুল হক। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সম্প্রতি এক ভ্রমণকাহিনিতে জানিয়েছেন, এ বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দুই পরিবার নিয়ে জুরিখ ও লুসার্নে কয়েক দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা তার চোখে খুলে দিয়েছে জীবন্ত প্রকৃতির এক নতুন রূপ। শীতের অবসানে বসন্তের যে সৌন্দর্য প্রকৃতিতে ধরা দেয়, তা ছবির চেয়ে বহুগুণে বেশি হৃদয়ছোঁয়া বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জুরিখ শহরে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়েছে জুরিখ হ্রদের শান্ত ও জীবন্ত জলরাশি। সূর্যের আলোয় রুপালি হয়ে ওঠা হ্রদের বুকে দূরের পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি মনে হয়েছে স্বপ্নের মতো। শহরের বিখ্যাত অভিজাত সড়ক বানহফস্ট্রাশের সঙ্গে প্যারিসের শ্যঁজেলিজের সাদৃশ্য টেনেছেন লেখক, যদিও চরিত্রে দুটি সড়ক আলাদা। শহরের আধুনিকতা ও শৃঙ্খলার মধ্যেও প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর আত্মীয়তা দেখেছেন তিনি। পুরোনো স্থাপত্য, গির্জার চূড়া আর পাথরে বাঁধানো পথ—সবকিছুতে রয়েছে সৌন্দর্যের এক মিতব্য�়ী সংস্কার যা চোখে ধাঁধা লাগায় না, কিন্তু মন থেকে সহজে মুছে যায় না।
জুরিখ থেকে লুসার্নের যাত্রাটিও ছিল চোখজুড়ানো। মাত্র ৫০ মিনিটের ট্রেনযাত্রায় জানালার বাইরে একের পর এক বদলে গেছে দৃশ্যপট। সবুজ প্রান্তর, ঢেউখেলানো পাহাড় আর ছোট ছোট জনপদ পেরিয়ে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। নিচের উপত্যকায় বসন্তের সবুজ উৎসব আর পাহাড়ের উচ্চ শিখরে শীতের শুভ্রতা—একই দৃশ্যে দুই ঋতুর সহাবস্থান লেখককে বিস্মিত করেছে। লুসার্ন শহরের প্রকৃত রূপ নাকি লুকিয়ে আছে তার হ্রদের বুকে। তাই স্থলপথে শহর দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রায় চার ঘণ্টার ফেরিযাত্রায় অংশ নেওয়ার। খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে পাহাড় ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস আর জলের স্নিগ্ধ গন্ধ উপভোগ করেছেন। ফেরি যত এগিয়েছে, দুই তীরে ছোট ছোট জনপদের খেলনার ঘরের মতো বাড়িঘর আর গির্জার চূড়া দেখে মনে হয়েছে এক বিশাল নিসর্গচিত্রের ভেতর দিয়ে ভেসে চলেছেন।
পথে রিগি স্টপে বিরতি নেওয়া হয়। লেখকের বন্ধু পরিবার পাহাড়ি ট্রেনে চড়ে মাউন্ট রিগির চূড়া থেকে লুসার্ন হ্রদ ও আল্পসের বিস্তৃত দৃশ্য উপভোগ করেন। এদিকে লেখক ও তাঁর স্ত্রী রিগি পর্বতের ঢালে একটি রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরে নেন। এই প্রসঙ্গে লেখক উল্লেখ করেছেন, সুইজারল্যান্ড ইউরোপের অন্যতম ব্য�়বহুল দেশ, যেখানে হোটেল থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া—সব কিছুর মূল্যই পর্যটকের পকেটে বেশ চাপ সৃষ্টি করে। তবে হ্রদের নির্মল সৌন্দর্যের সামনে সেই ব্য�়ের কথা আর মনে থাকে না। ফেরিযাত্রার মাঝামাঝি সময়ে সময়ের হিসাবটাই হারিয়ে গিয়েছিল। হ্রদের বিস্তার, দূরের পাহাড় আর পাশের মানুষের উপস্থিতিই তখন যথেষ্ট ছিল।
ফেরি থেকে ফেরার পথে শহরটিকে নতুন চোখে দেখেছেন লেখক। তীরের ভবন, গির্জার চূড়া—সবকিছুর পেছনে পাহাড়ের বিশাল প্রেক্ষাপট জুড়ে থাকায় মনে হয়েছে, লুসার্নকে সত্যিকার অর্থে চেনার জন্য অন্তত একবার হ্রদ থেকে শহরের দিকে তাকানো দরকার। বিদায়ের আগে মনে হয়েছে, আরেকটি দিন যদি পাওয়া যেত! কিন্তু ভ্রমণের সৌন্দর্যই সম্ভবত এর স্বল্প স্থায়িত্বের মধ্যে। সবকিছু স্থায়ী হলে স্মৃতি এত মূল্যবান হতো না। লেখকের মতে, মানুষ একটি দেশ থেকে ফিরে আসে, কিন্তু সেই দেশ পুরোপুরি তার কাছ থেকে ফিরে আসে না। কিছু আলো থেকে যায় চোখে, কিছু বাতাস থেকে যায় মনে, আর কিছু পথ থেকে যায় হৃদয়ের ভেতর। জুরিখ ও লুসার্ন এখন তাঁর কাছে কেবল দুই শহরের নাম নয়, জীবনের কয়েকটি উজ্জ্বল দিনের স্মারক।




