চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অবস্থিত মোবারকদী গ্রামটি 'নৌকা গ্রাম' নামে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই গ্রামের প্রায় চার শতাধিক মানুষ, শতাধিক পরিবারের সদস্য, বর্ষাকালকে সামনে রেখে নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের হাতে তৈরি ডিঙি নৌকাগুলো চাঁদপুর ছাড়াও নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের মতো জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হয়। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে মতলব-বাবুরহাট সড়কের পশ্চিম পাশে এই গ্রামটির অবস্থান।

পঞ্চাশ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর সরকার এই পেশার সাথে যুক্ত আছেন প্রায় পাঁচ দশক ধরে। বছরের বেশির ভাগ সময়েই তাঁর কাছে তেমন কাজ থাকে না, তবে বর্ষা এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। নৌকা তৈরি ও বিক্রির মাধ্যমেই তিনি মূলত সারা বছরের সংসার খরচ জোগাড় করেন। তাঁর মতো আরও অনেকে আছেন যারা এই মৌসুমী পেশার উপর নির্ভরশীল। রোববার দুপুরে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, আট থেকে দশটি স্থানে লোকজন কাঠের ডিঙি নৌকা তৈরি ও বিক্রি করছেন। কারিগরদের ঠক ঠক শব্দে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে ক্রেতারাও দরদাম করছেন তৈরি নৌকার।

একই গ্রামের আবদুল মান্নান প্রধান জানান, মাঝারি আকারের একটি নৌকা তৈরি করতে ব্যয় হয় চার থেকে ছয় হাজার টাকা। বিক্রি করা হয় আট থেকে দশ হাজার টাকায়। ফলে প্রতিটি নৌকায় গড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা লাভ থাকে। তাঁর বাবা, চাচা ও জ্যাঠাসহ পরিবারের সদস্যরা ১৯৮০ সালের আগে থেকেই এই পেশার সাথে যুক্ত। তবে কাঠের দাম বেশি হওয়ায় অনেক সময় প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয় না। তবুও পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিতে চান না কেউই।

কারিগর চান্দু মিয়া ও খোরশেদ আলী জানান, একটি নৌকা বানিয়ে তারা এক হাজার টাকার বেশি আয় করেন। বর্ষা শেষ হলে তারা দিনমজুরির কাজ করেন। তবে তিন মাসের এই উপার্জনই বছরের বাকি সময়ের ভরসা। নৌকা তৈরির কাজে মেহগনি, চাম্বুল ও কড়ই গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে ভালো করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। বর্ষার তিন মাসে একজন কারিগর এক থেকে দেড় শতাধিক নৌকা তৈরি করতে পারেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম জানান, তিনি এই গ্রামের নৌকা তৈরির পেশার কথা শুনেছেন। একটি গ্রামের এত লোক এই পেশায় যুক্ত থাকা সত্যিই বিরল। তিনি সেখানে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।