কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ছয় দশকেরও বেশি সময় পার হলেও নাগরিক সুবিধার মৌলিক একটি অবকাঠামো তথা বর্জ্য ফেলার স্থায়ী স্থানান্তর কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস থেকে সৃষ্ট ৩০ টন আবর্জনা ফেলতে হচ্ছে শহরের প্রধান সড়কের ধার ও বেশ কয়েকটি খোলা জায়গায়।
ফলে বছরের পর বছর ধরে এসব স্থানে জমতে থাকা বর্জ্যের স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পথচারীরা তো বটেই, স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও বাসিন্দাদের এই দূষিত পরিবেশের ভিতর দিয়েই চলাফেরা করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। পরিস্থিতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য—দুটির জন্যই উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
বর্জ্যের এই উন্মুক্ত স্তূপ নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কিশোর কুমার ধর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পচন ধরা বর্জ্যে জীবাণুর জন্ম হয়। সেখানে মাছি, মশা, কুকুর এমনকি গবাদি পশুরাও খাবারের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করে। এসব মাছি ও মশার মাধ্যমে জীবাণু কাছাকাছি বসবাসরতদের বাড়ি ও খাবারে ছড়াতে পারে, যা ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েডের মতো নানাবিধ সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে কিছু বছর আগে উপজেলার কালিকাপ্রসাদ এলাকায় আনুমানিক ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থান নির্ধারণের পর সেখানকার জনগোষ্ঠীর কড়া বিরোধিতার কারণে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তী সময়ে বিকল্প আরও কয়েকটি জমি চিহ্নিত করা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই রকম স্থানীয় প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় কর্তৃপক্ষকে।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুক বলেন, “সবাই একটি পরিচ্ছন্ন নগরী আশা করেন, কিন্তু নিজ এলাকার পাশে ডাম্পিং স্টেশন কেউই রাখতে চান না। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদল না হলে এর স্থায়ী সমাধান করাটা দুরূহ হয়ে থাকবে।” বর্তমানে ভৈরবের স্টেশন সড়ক, জিল্লুর রহমান শহর রক্ষা বাঁধ সড়ক, গাছতলাঘাট সেতু ও চণ্ডীবের-কালিপুর সেতু— অন্তত এই চারটি স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
সম্প্রতি স্টেশন সড়ক এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি খাসজমির একটি বড় আকারের পুকুর আবর্জনায় প্রায় পরিপূর্ণ। পচা বর্জ্যের স্তূপে কুকুর খাদ্যের খোঁজে ঘুরছে এবং চারপাশে মাছির উপদ্রব চোখে পড়ার মতো। দুর্গন্ধের প্রকোপ এতটাই যে কাছাকাছি তেমন কোনো দোকানপাটও গড়ে ওঠেনি। সেখানে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাকিব খান জানান, বর্জ্য ফেলার কোনো বিকল্প জায়গা না থাকায় এই স্থানেই ফেলতে বাধ্য হন তারা। কিন্তু স্থানীয় জনগণের বকুনি বা মারধরের ভয়ে ভোররাতে দ্রুত কাজ সেরে চলে যেতে হয়।
শহরের সবচাইতে বড় এই উন্মুক্ত ভাগাড়ের পাশেই অবস্থিত দ্য নর্থ সাউথ স্কুল অ্যান্ড প্রাইমারি এডুকেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা আক্তারুজ্জামান বলেছেন, দুর্গন্ধ প্রতিরোধে পুরো স্কুল ঘিরে বেড়া দেওয়া হলেও তাতে গন্ধ আটকানো সম্ভব হয়নি। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ ও মানববন্ধন করেও কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ডাম্পিং স্টেশন-বিহীন সকল পৌরসভাকে সরকারি খাসজমি ইজারা প্রদানের মাধ্যমে এমন স্টেশ তৈরির কাজে সহায়তা করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ভৈরবেও বিকল্প জমির খোঁজ চলছে বলে পৌর সূত্রে জানা গেছে।
পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশিদ জানান, ডম্পিং স্টেশন নির্মাণে তাদের আন্তরিকতা, উদ্যোগ ও প্রস্তুতির কোনো অভাব নেই। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া। জায়গা পাওয়া গেলেও সেখানকার লোকজনের আপত্তি আসে। নাগরিকদের সহযোগিতার অভাব থাকলে বিশাল এই সংকটের মীমাংসা করা যাবে না এবং নগরীর বর্জ্য সড়কের পাশেই পড়ে থাকতে পারে।




