চট্টগ্রাম মহানগর ও সাত জেলা নিয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) করা 'শুটার' তালিকায় মোট ১০৯ জনের নাম রয়েছে। কিন্তু একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, তালিকার বাইরে আরও অন্তত ১৩৯ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতি পুলিশের এ ধরনের তালিকার পরিপূর্ণতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।

অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, একমাত্র চট্টগ্রাম মহানগরীতেই তালিকার বাইরে রয়েছেন অন্তত ৮৫ জন অস্ত্রধারী, যেখানে তালিকায় নাম আছে মাত্র ৯ জনের। বিভাগের অন্যান্য জেলা—ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুরেও একই চিত্র ধরা পড়েছে। ফেনী জেলার তালিকায় মাত্র ৫ জনের নাম থাকলেও, সেখানে আরও অন্তত ৩৩ জন অস্ত্রধারীর তথ্য মিলেছে, যাদের মধ্যে অনেকেই সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর অনুসারী বলে জানা গেছে।

পুলিশের তালিকায় নাম থাকা অস্ত্রধারীদের অনেকেই খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি। যেমন তালিকাভুক্ত শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে এবং তিনি নিজস্ব বাহিনী পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ। অথচ তার মতো বাহিনী পরিচালনা, প্রকাশ্যে অস্ত্র মহড়া ও গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা অনেকের নামই এই তালিকায় ঠাঁই পায়নি। এর মধ্যে রয়েছেন আলোচিত সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ, টেম্পু ইসমাইল, মোবারক হোসেন ইমন এবং আরও অনেকে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া এবং গুলি ছোড়া ৪৬ জনকে পুলিশ শনাক্ত করলেও, আশ্চর্যজনকভাবে তাদের কারো নামই এই ‘শুটার’ তালিকায় অনুপস্থিত। এদের মধ্যে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক নেতা-কর্মীও রয়েছেন, যাদের অস্ত্রহাতে ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই ত্রুটিপূর্ণ তালিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, “তালিকা অসম্পূর্ণ হলে অভিযানও অসম্পূর্ণ হবে; ফলে অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে।”

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একজন সহকারী কমিশনার জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে শুটারদের বেশির ভাগকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের নাম তালিকায় না আসার কারণ হতে পারে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রায়শই দেখা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশি পাহারায় থাকা এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় জড়িতদের এখনো গ্রেপ্তার করতে পারার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে চট্টগ্রামের পেশাদার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বিভাগের ১১ জেলায় ৩৯০টি খুনের মামলা হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। এদের অনেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত, এবং বিএনপি বা আওয়ামী লীগের পাশাপাশি কিছু অস্ত্রধারীকে এনসিপি-র সদস্যদের সংগেও দেখা গেছে।