ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে শনিবার বিকেলে 'জুলাই-উত্তর রাজনীতি: গতি ও গত্যন্তর' শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

মজিবুর রহমান মঞ্জু তার বক্তৃতায় বিগত দেড় দশকে বিএনপির আন্দোলনের চারটি মূল দাবি পূরণের বিষয়টি উল্লেখ করেন। দাবিগুলো হলো—খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা, নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে; দলটি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরেছে। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাকে গণ্য করেন, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জুলাই-উত্তর রাজনীতির বাস্তবতা প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান তিনটি বিষয় তুলে ধরেন: জুলাই শক্তির মধ্যে অনৈক্য, বিজয়ীদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পরাজিতদের পুনরায় ময়দানে ফিরে আসার আস্ফালন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, যুক্তি, চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমেই তাদের মোকাবিলা করতে হবে—কোনো গালিগালাজ বা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।

সারোয়ার তুষার তার বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে মধ্যপন্থার রাজনীতি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা জানান। তার মতে, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরাগমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, কারও রাজনীতির বিরোধিতা করা যেতে পারে কিন্তু রাজনীতি করার অধিকার প্রত্যাখ্যান করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। জুলাই সনদের ব্যাপারে সারোয়ার তুষার দাবি করেন, দলিলটিতে ফ্যাসিবাদী বা উগ্র ডানপন্থী কোনো উপাদান নেই; বরং বিশ্বের উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মানদণ্ডের সঙ্গে এটি সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি আরও মন্তব্য করেন, জুলাই বিপ্লব এখনো একটি জীবন্ত বাস্তবতা এবং নানা কূটকৌশল ও বিতর্কের মুখে একে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, শেখ হাসিনার পতনের রাতেই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করে ফেলা হয়। বঙ্গভবনে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিনিধি নেই; বরং আগে থেকেই পরিকল্পিত একটি কাঠামো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তার অভিযোগ, ওই রাতেই জুলাই বিপ্লব ও শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্যে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হিন্দুস্তানি দালাল গোষ্ঠীর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি, ফলে পরিস্থিতি আগের মতই থেকে গেছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির নানা দিক তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।