বরিশাল নগরের বান্দ রোডের কে বি হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আজ শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১১–দলীয় ঐক্যজোটের বিভাগীয় সমাবেশ। থেমে থেমে বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বেলা দুইটা থেকে শুরু হওয়া এই সমাবেশে বরিশাল নগরসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে জামায়াত ও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে অংশ নেন। দুপুর ১২টার পর থেকেই সমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরকারকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় যদি দ্রুত বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে এই সরকারকেও অকার্যকর করে দেওয়া হবে। তাঁর মতে, নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সময় এখনই। তিনি অভিযোগ তোলেন, বিএনপি মেকানিজমের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে গণভোটের রায় ভুলে গেছে। তাই সরকার যদি জনগণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে জনগণের সরকার হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার ভুল পথে রয়েছে মন্তব্য করে জামায়াতের আমির বলেন, এই পথ পরিহার করে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ২৫ জুলাই সিলেটের সমাবেশের আগেই এই দাবি মেনে নেওয়ার সময় আছে, অন্যথায় ঢাকায় মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে একজন অবৈতনিক শিক্ষক রয়েছেন যিনি প্রায়ই সংবিধান শেখান। তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলে তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটলে তা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

শফিকুর রহমান দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি ভোলাবাসীর জন্য সেতু নির্মাণ ও দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন স্থাপনের দাবি জানান। তাঁর মতে, বরিশালকে বঞ্চিত রেখে দেশের সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, জনগণের সঙ্গে আর কত ধোঁকাবাজি করা হবে? প্রয়োজনে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। জুলাই আন্দোলনে মানুষ জীবন দিয়েছে কিন্তু মাথা নত করেনি। প্রকৃত ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করার পরে ডামি ফ্যাসিবাদকেও প্রত্যাখ্যান করা হবে। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, রাজপথে না থেকে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চান, কিন্তু জনগণের রায় অমান্য করা হলে আন্দোলনের পথেই যেতে হবে। সময় থাকতে ভালো হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গও তোলেন। মানুষের হাতে ফ্যামিলি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে দায় এড়ানো যাবে না; প্রয়োজন হলে হাতে চিড়া–মুড়ি নিয়েই আবার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামতে হবে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াতের আমির।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনিও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে আবারও গণ–অভ্যুত্থানের মতো কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন। এখনো হরতাল–অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি, তবে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় তা দেওয়া হবে।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে সরকারপ্রধান গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর জনগণের রায় অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের জনগণ ক্ষমতা দিয়েছে, তার মানে এই নয় যে যা খুশি তাই করা যাবে বা জনগণের সঙ্গে ছলনা করা যাবে।

বিএনপির আন্দোলন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর মতে, বিএনপি মূলত গণতন্ত্রের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য আন্দোলন করেছে। তারা গণ–অভ্যুত্থানে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে এখন আর পরিবর্তন বা সংস্কারের কথা বলে না, এমনকি তাদের ঘোষিত ৩১ দফার কথাও তারা ভুলে গেছে। অথচ ৩১ দফার প্রথম প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন। তিনি জানান, সংবিধান সংস্কারের নামে কোনো প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না; প্রয়োজন হলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও নতুন গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, সীমান্ত ব্যবস্থার সংস্কার, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূল, দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মতো আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বরিশালের কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি মনে করিয়ে দেন, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি; বরং ছাত্রদল, যুবদল ও কৃষক দলের চাঁদাবাজি বেড়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ (এবি) পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ফুয়াদ), বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু প্রমুখ।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ তাঁর বক্তব্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং এটি আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। প্রতিবেশী ভারত প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে প্রতিনিয়ত মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তারা এসব উসকানিতে কান দেবেন না।