শিক্ষাজীবনে এসএসসি, এইচএসসি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর অনেক শিক্ষার্থীই হতাশা ও আত্মগ্লানিতে ভোগে, যা কখনো কখনো আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও নিয়ে যায়। প্রশ্ন উঠেছে, জীবনের চেয়ে কোনো পরীক্ষার ফলাফল কি সত্যিই বড় হতে পারে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটেই না।

চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জিপিএ পাওয়ার পরও নম্বর কম হওয়ায় মন খারাপ করেছে বলে জানা গেছে। পরীক্ষার ফলাফলের ওপর জীবনের অনেক কিছু নির্ভর করলেও এটি যে জীবনের শেষ কথা নয়, তা মনে রাখা জরুরি। কেউ পড়ালেখা শেষে দেশে চাকরি বেছে নেবে, কেউ উদ্যোক্তা হবে, আবার কেউ বিদেশেও গন্তব্য খুঁজে নিতে পারে। কোনো পরীক্ষার ফলাফলের কারণে জীবনের গতিপথ পুরোপুরি থেমে যাওয়ার কথা নয়।

তবে বাস্তবতা হলো, ফলাফল আশানুরূপ না হলে অনেক শিক্ষার্থীকে পরিবারের কাছ থেকে বকাঝকা বা মারধরের শিকার হতে হয়। দেশের বহু পরিবারে এই চিত্র দেখা যায়। অভিভাবকেরা খোঁটা দিয়ে কথা বলেন, অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করে সন্তানকে অপমান করেন। ফলে নিজ পরিবারেই অপমানিত হওয়ার ভয় বা লজ্জা থেকে শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। অন্যদিকে অভিভাবকেরা চান সন্তান ভালো ফল করুক, ভবিষ্যতে সফল হোক। ফল খারাপ হলে সন্তান পিছিয়ে পড়বে—এই ভয় থেকেই তাঁদের এই আচরণ। বিশেষ করে সাধারণ পরিবারগুলোর অভিভাবকেরা বিষয়টিকে এভাবেই দেখে থাকেন।

আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিতদের কটু মন্তব্যের ভয়ও একটি বড় কারণ। একজনের ব্যর্থতার খবর শুনে অন্যের সাফল্যের গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলা মানুষের স্বভাব। ভবিষ্যতে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে সন্তানের একাডেমিক ক্যারিয়ারের কথা জিজ্ঞেস করা হলে সত্য বলতে গিয়ে লজ্জায় পড়তে পারেন অভিভাবক। এমন আশঙ্কা এবং রাগ-দুঃখের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফেলেন। তাই সমস্যাটা শুধু পরিবারে নয়, পুরো সমাজে। সমাজের এই আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ও একজন শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

যে বয়সে শিক্ষার্থীরা এসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন তাদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থা খুবই সংবেদনশীল থাকে। হরমোনজনিত কারণে অল্পতেই অভিমান বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে তারা। তাই খারাপ ফলাফলের পর আবেগের বশবর্তী হয়ে গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অভিভাবকের। সন্তানকে জীবনকে চেনানো এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতা মোকাবিলার কৌশল শেখানো প্রয়োজন। সুখ-দুঃখ, সাফল্য-ব্যর্থতা জীবনেরই অংশ—এই বোধ নিজের মধ্যে ধারণ করতে হবে এবং সন্তানকেও তা বোঝাতে হবে।

জীবনের আনন্দ খুঁজে নিতে শেখাতে হবে সন্তানকে। প্রকৃতির সৌন্দর্য—আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি, রংধনু, অরণ্য, সমুদ্র, পাহাড়—এগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আমাজনের গভীর অরণ্যে না গিয়েও পৃথিবীর বিশালতাকে বোঝানো সম্ভব। জীবনকে উপভোগ করতে শেখাতে হবে। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে রাগ না করে বৃষ্টিতে ভিজে দুজনের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আশার কথা বলতে হবে, নিরাশার নয়। একটা ফল খারাপ হয়েছে, আরেকটা ভালো হবে—এভাবে উৎসাহ দিতে হবে। সন্তানের পছন্দের কাজে উৎসাহ দেওয়া, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শেখানো এবং ভুল করলে ভালোমন্দের পার্থক্য বোঝানো উচিত। ধরে নেওয়া যাবে না যে বকাঝকা করলেই সন্তানকে ঠিক করা যাবে।

অভিভাবকদের সন্তানের সহযোগী হয়ে উঠতে হবে। বকাবকি বা দুর্ব্যবহার না করে পড়ালেখায় পাশে দাঁড়ালে সন্তানের জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। এছাড়া যেকোনো কাজে ভালো করতে হলে সুস্থতার বিকল্প নেই। থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা, রক্তশূন্যতা বা মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার কারণে শিক্ষার্থীর একাডেমিক ফলাফল খারাপ হতে পারে। তাই ক্লাসের সময়, পরীক্ষার আগে-পরে সব সময় সন্তানের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশে এমন কিছু আছে কি না, যা সন্তানের মনোযোগ নষ্ট করছে, তাও লক্ষ করতে হবে।