বুধবার বিকেলে ঢাকার গুলশানে অবস্থিত ক্রাউন প্লাজা হোটেলের দ্য ডেলি—লবি ক্যাফেতে যাত্রা শুরু হলো ‘ফ্লোর’—ফর লাভ অব রিডিং। দ্রুতগতির ডিজিটাল জীবনে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ যখন ক্রমেই কমছে, তখন পাঠপ্রেমীদের জন্য বই, কফি, খাবার ও আলাপচারিতাকে এক ছাদের নিচে এনে তৈরি করা হয়েছে এই নতুন পরিসর। একই আয়োজনে দ্য ডেলির নতুন খাদ্যতালিকাও উন্মোচন করা হয়; ফলে অনুষ্ঠানটি সাহিত্য, সংস্কৃতি, রসনা ও আতিথেয়তার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক ও কবি সাজ্জাদ শরিফ। আরও উপস্থিত ছিলেন লেখক সাদাত হোসাইন, ডরিন গ্রুপের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্য ফিরোজ আসাদ এবং ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের জেনারেল ম্যানেজার কার্থি ভিকে। অতিথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা সরিয়ে ‘ফ্লোর’-এর উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে সাজ্জাদ শরিফ, সাদাত হোসাইন ও কার্থি ভিকে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

কার্থি ভিকে তাঁর বক্তব্যে ব্যাখ্যা করেন, বর্তমান সময়ে মানুষ যখন ডিজিটাল পর্দায় অধিক সময় ব্যয় করছে, তখন তাদের বাস্তব বইয়ের স্পর্শে ফিরিয়ে আনার চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগের জন্ম। তিনি মনে করেন, ছোট প্রচেষ্টাও বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারে। গুলশানের মতো এলাকায় স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসে পড়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম—এই ঘাটতি পূরণেই এমন একটি জায়গা গড়ে তোলার পরিকল্পনা। তাঁর ভাষায়, ‘ফ্লোর’ কেবল একটি প্রকল্প নয়; বরং পাঠের প্রতি ভালোবাসার একটি আমন্ত্রণ। পাঠকরা এখানে কফির সঙ্গে পছন্দের বই পড়তে পারবেন, চাইলে বইটি সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন এবং পড়া শেষ হলে তা ফেরত দিতে পারবেন। এ ছাড়া ‘টেক ওয়ান, লিভ ওয়ান’ পদ্ধতিতে একজন পাঠক একটি বই নিয়ে যেতে পারবেন এবং নিজের পড়া একটি বই রেখে যেতে পারবেন; ফলে পাঠকরাই ধীরে ধীরে এই সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবেন। ভ্রমণের সময় পরবর্তী বই বাছাইয়ের দ্বিধাও এই বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বইয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও তুলে ধরে কার্থি ভিকে বলেন, বই তাঁকে জীবনের বিভিন্ন সময়ে অন্য এক জগতে নিয়ে গেছে এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে।

সাজ্জাদ শরিফ তাঁর বক্তব্যে জোর দেন যে, বই থেকে মানুষের দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতার ঐতিহ্য থেকেও বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষের ইতিহাস, জ্ঞান ও মানব-অভিজ্ঞতার বিপুল অংশ বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষ সেই বই থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। তাঁর মতে, বিশ্বের জ্ঞাননির্ভর সমাজগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে বই এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। একটি বই পাঠককে আরও বড় একটি জগতে নিয়ে যায়—যেখানে সে জ্ঞান অর্জন করে, মনোযোগ দিতে শেখে, প্রশ্ন করে, তর্ক করে, বিতর্ক করে এবং নিজের কল্পনার সীমানা আরও বিস্তৃত করে। বই কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি চিন্তার একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া। বই মানুষের কৌতূহল বাড়ায়, সমালোচনামূলকভাবে ভাবার ক্ষমতাকে শাণিত করে এবং পরিচিত সীমানার বাইরে কল্পনা করার সুযোগ তৈরি করে। ‘ফ্লোর’-এর মতো উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই—কারণ এমন উদ্যোগ মানুষকে শুধু বই পড়ার সুযোগ দেয় না, বইয়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞান, চিন্তা ও বৃহত্তর মানব-অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবারও যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

লেখক সাদাত হোসাইন বইয়ের বিশেষ ক্ষমতা নিয়ে কথা বলেন—একটি গ্রন্থ পাঠককে তার পরিচিত পরিবেশ থেকে বের করে অন্য মানুষের জীবন, অনুভূতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার মধ্যেও প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, জীবনের বিভিন্ন সময়ে পড়া বই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও পৃথিবীকে দেখার পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বই মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়ায় এবং নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে তাকাতে শেখায়। দ্রুতগতির জীবনে মানুষের মনোযোগ যখন নানা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বই এমন একটি মাধ্যম, যা মানুষকে গভীরভাবে কোনো একটি বিষয়, গল্প বা চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। বইয়ের মাধ্যমে নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়ার পাশাপাশি পৃথিবীকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। সেই কারণেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বইয়ের জন্য জায়গা তৈরি করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

‘ফ্লোর’-এর সংগ্রহে পাঠকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বই সাজানো হয়েছে। নেতৃত্ব, কথাসাহিত্য, সমকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যসহ মোট সাতটি বিভাগে বইগুলো বিন্যস্ত। এখানে প্রতিদিন থাকবে ‘বুক পিক অব দ্য ডে’, যার মাধ্যমে পাঠকদের সামনে একটি নির্বাচিত বই তুলে ধরা হবে। যারা কী পড়বেন তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তারাও প্রতিদিন নতুন একটি বই আবিষ্কারের সুযোগ পাবেন। পরিকল্পনাটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে বই পড়া কোনো আনুষ্ঠানিক বা কঠিন অভ্যাস মনে না হয়। কফি খেতে এসেও কেউ চাইলে একটি বই হাতে তুলে নিতে পারবেন; খাবারের অপেক্ষায় বসেও পড়তে পারবেন কয়েকটি পৃষ্ঠা। আবার চাইলে দীর্ঘ সময় বসে বইয়ের জগতে ডুবে থাকতে পারবেন। নতুন মেনুর সঙ্গে এই পাঠপরিসরের সমন্বয়ে দ্য ডেলি হয়ে উঠবে এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ শুধু খাবার খেতে নয়, বরং কিছুটা সময় নিজের মতো করে কাটাতেও আসবেন।

উদ্বোধনী আয়োজনের শেষ পর্বে ওয়েসিস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ হাই টি। সেখানে লেখক, প্রকাশক, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা সাহিত্য, সংস্কৃতি, খাবার এবং পরিবর্তনশীল পাঠাভ্যাস নিয়ে মতবিনিময় করেন। সব মিলিয়ে ‘ফ্লোর’ সামনে এনেছে একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—ডিজিটাল পর্দার বাইরে এখনও বইয়ের একটি নিজস্ব জগৎ আছে। সেই জগতে ফিরে যেতে খুব বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটি বই হাতে নেওয়া, কয়েক মুহূর্ত থামা এবং পড়া শুরু করা। ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের এই উদ্যোগ সেই থামার মুহূর্তটিই তৈরি করতে চায়—এক কাপ কফি, একটি বই এবং নিজের জন্য কিছুটা সময় নিয়ে।