বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবর্তনকে প্রায়ই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। ক্ষমতাসীন দল, মন্ত্রিসভা এবং নীতিগত অগ্রাধিকার বদলালেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—রাষ্ট্রের কাঠামো ও আচরণে কি প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে? সরকার বদলানো এবং রাষ্ট্র বদলানো এক নয়; একটি নির্বাচন নতুন সরকার আনতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের রূপান্তর ঘটে যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের সেবায় নিয়োজিত হয় এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান নিছক একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচলিত পদ্ধতি নিয়ে মানুষের গভীর অসন্তোষ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছিল। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই নির্বাচনব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার, পুলিশ ও প্রশাসন সংস্কারের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তবে রাষ্ট্র কতটা বদলেছে, তা এখন মূল পরীক্ষা।

সংস্কার বলতে শুধু সংবিধানের কয়েকটি ধারা সংশোধন বা নির্বাচনব্যবস্থার রদবদল বোঝায় না। প্রকৃত সংস্কার হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ওপর এমন কর্তৃত্ব করতে পারবে না যাতে রাষ্ট্র ক্ষমতাবানদের সেবায় নিয়োজিত হয়ে যায়। এজন্য প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে সমান গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য তখনই বোঝা যায়, যখন একজন নাগরিক সাধারণ সরকারি সেবা পেতে বাধার সম্মুখীন হয় না এবং তরুণদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিতে নিহিত, সরকারের শক্তিতে নয়। একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও একটি সুসংহত প্রতিষ্ঠান কয়েক প্রজন্ম ধরে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা যদি জবাবদিহিমূলক থাকে, তবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করা। উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল অবকাঠামো বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়; সরকারি সেবার গতি, চিকিৎসার নিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি এবং উদ্যোক্তার ব্যবসা করার সহজ শর্তও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা রিজার্ভ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নিয়মকানুনের পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকে, বিনিয়োগ নিরাপদ থাকে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সস্তা শ্রম নয়, বরং আইনের শাসন, দক্ষ মানবসম্পদ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা খোঁজে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ ভূগর্ভে নয়, মানুষের মেধায়। এই সম্পদ কাজে লাগাতে না পারলে জনসংখ্যা শক্তি নয়, বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর, যেখানে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া জ্ঞান অর্জনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই ধরনের শিক্ষা ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে বিশ্লেষণ, যুক্তি, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুদের জিজ্ঞেস করতে হবে ‘তুমি কীভাবে ভাবলে?’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রির পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় শ্রেণির দৃষ্টিতে না দেখে সমান মর্যাদা দিতে হবে। এআইকে ভয় না পেয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

প্রশাসনিক সংস্কারও অপরিহার্য। সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ স্থানীয় পর্যায়ে—ভূমি, পুলিশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর, বিদ্যুৎ ও পরিবহন সেবায়। রাষ্ট্রকে এখানে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে, যাতে মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় না পেয়ে আস্থা রাখতে পারে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও মৌলিক পরিবর্তন দরকার। নির্বাচনে জয় মানে রাষ্ট্রের মালিকানা নয়, আর বিরোধী দলে থাকা মানে রাষ্ট্রের শত্রু হওয়া নয়। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলো যত দ্রুত গ্রহণ করবে, গণতন্ত্র তত শক্তিশালী হবে। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান বদলায় না; প্রয়োজন দক্ষ জনবল, স্বচ্ছ নিয়োগ ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা।

সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়, তার ওপর। আমাদের সামনে দুটি পথ—পুরোনো সংস্কৃতিকে নতুন নামে চালিয়ে যাওয়া, অথবা কঠিন পথ বেছে নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপর, আইনকে ক্ষমতার ওপর এবং নাগরিককে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। প্রশ্ন উঠতে হবে ‘কে দেশ চালাবে’ নয়, ‘দেশ কীভাবে চলবে’। ইতিহাস কোনো সরকারকে শুধু শাসনকাল দিয়ে বিচার করে না; এটি বিচার করে মানুষ রাষ্ট্রকে কতটা শক্তিশালী করে রেখে গেছে। তাই আজকের প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নতুন সরকার পেয়েছি, নাকি সত্যিই নতুন রাষ্ট্র গড়ার পথে হাঁটছি? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম আমাদের কীভাবে মনে রাখবে।