মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিরাপত্তা ও সামরিক পদে নতুন নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহসেন রেজায়ি। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এই প্রধান ১৬ বছর ধরে সংস্থাটি পরিচালনা করেছেন এবং ১৯৮০-এর দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ও তিনি কমান্ডার-ইন-চিফের দায়িত্বে ছিলেন। তাকে একই সাথে এসএনএসসিতে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, গত সোমবার সামরিক বাহিনীর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। 'যৌথ যুদ্ধ কমান্ড'-এর প্রধান আলী আবদুল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন আলী ওজমাই। কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকে আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ নিশ্চিত করা হয়েছে, যিনি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত মোহাম্মাদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ভাহিদিকে 'মেজর জেনারেল পদমর্যাদায়' এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি আল-জাজিরাকে বলেছেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। তার মতে, খামেনি, ভাহিদি এবং আইআরজিসির নেতৃত্ব সবাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয়। আজোদি আরও বলেন, রেজায়ির দীর্ঘ প্রতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার থেকে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তার যথেষ্ট কর্তৃত্ব রয়েছে। তার এই নিয়োগের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংহতি আরও জোরালো করা, সংগঠনটির ওপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা এবং এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তির দক্ষতা কাজে লাগানো, যিনি আইআরজিসিকে আজকের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
রেজায়ি এর আগে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সেক্রেটারি ছিলেন এবং ১৯৮০-এর দশকের ভয়াবহ ইরাক যুদ্ধ শেষে ধীরে ধীরে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে মনোযোগ দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতার বিরোধী হিসেবে পরিচিত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সময় অর্থনৈতিক বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়ের ক্ষমতা পেলেও তিনি কখনো নির্বাচিত কোনো পদে ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি সফল হননি। মোজতবা খামেনি তার নিহত বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পরপরই রেজায়িকে সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা করা হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার বার্তা দিয়ে আসছেন এবং গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিরোধিতা করেছেন। তার যুক্তি ছিল, তার অবস্থান মোজতবা খামেনির অবস্থানের কাছাকাছি। শেষ পর্যন্ত কিছু আপত্তি সত্ত্বেও খামেনি ওই সমঝোতায় অনুমোদন দিয়েছিলেন, তবে জুলাইয়ের শুরুতে সমঝোতাটি স্থগিত হয়ে যায়।
রেজায়ির এই নিয়োগ নিয়ে ইসরায়েল তীব্র সমালোচনা করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রেজায়ি ও ভাহিদির বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যাতে ৮৫ জন নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী 'সন্ত্রাসবাদের পূজা' করে এবং এর পরিকল্পনাকারীদের পুরস্কৃত করে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পদোন্নতি দেয়।
জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সাথে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নুরনিউজের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, রেজায়ির নিয়োগ ইরানের যুদ্ধকালীন নতুন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরও বিস্তৃত 'কৌশলগত পুনর্গঠন' শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্পাদকীয়তে জোলঘাদরকে ব্যর্থতার কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা নাকচ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, রেজায়ি সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় করতে পারবেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জোলঘাদর পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাই তাকে সরিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে গালিবাফের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে সোমবার রেজায়িকে অভিনন্দন জানানো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে গালিবাফও ছিলেন।
ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন ভাহিদি বলেছেন, নিরাপত্তা পর্ষদে রেজায়ির আগমন 'যুদ্ধের ময়দান ও কূটনীতির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় এগিয়ে নিতে পারে'। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, 'গত দেড় বছরে পুরো বিশ্ব স্পষ্টভাবে দেখেছে, আমাদের দেশ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি দেশ। এ কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও বিজয়ের রহস্যও এটাই।'
এদিকে, রেজায়ির নিয়োগের ঘোষণার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাকে 'দৃঢ় সামরিক চিন্তাধারার' কমান্ডার হিসেবে তুলে ধরে ঐতিহাসিক একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। তেহরানের কট্টরপন্থীরা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং কেউ কেউ এটিকে ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের চুক্তিপন্থী সরকারের সমালোচনা করেছেন। অতি রক্ষণশীল নেতা সাঈদ জলিলির 'পায়দারি ফ্রন্ট'-এর সঙ্গে যুক্ত আইনপ্রণেতা আমির হোসেইন সাবেতি বলেছেন, জোলঘাদরের জায়গায় রেজায়িকে বসানোর বিষয়ে পেজেশকিয়ান দীর্ঘদিন ধরে নেতার বিরোধিতা করে আসছিলেন, শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছারই জয় হয়েছে।




