পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাদামতলী ফলের আড়ত এলাকায় ট্রাক থেকে চাঁদাবাজির দীর্ঘদিনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ফলবোঝাই ট্রাক পার্কিংয়ে রাখলেই দুই হাজার টাকা এবং খালি ট্রাকের জন্য এক হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ফি যেখানে মাত্র ১০০ টাকা, সেখানে এই আদায়কে চাঁদাবাজি বলেই অভিযোগ করছেন ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা। কোনো রশিদ ছাড়াই এই টাকা আদায় করা হয় বলেও জানা গেছে।

বেনাপোল থেকে ফল নিয়ে আসা ট্রাকচালক মেহেদী হাসান জানান, ট্রাক রাখলেই তাকে দুই হাজার টাকা দিতে হয়েছে। টাকা দিতে না চাইলে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। বাইরের চালকরা তাই চুপচাপ টাকা দিয়ে দেন। আরেক চালক মাসুম বিল্লাহ বলেন, ইজারাদারের লোকজন বলে পরিচয় দেওয়ায় কিছু বলতে পারেন না তারা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত হারের তালিকা অনুযায়ী, ওই পার্কিংয়ে ট্রাকের জন্য ফি ১০০ টাকা, মিনিবাস ৬০ টাকা, মাইক্রোবাস ৫০ টাকা এবং প্রাইভেট কার ৩০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ট্রাক থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকা এবং কনটেইনারবাহী লরি থেকে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে নদীর পাড়ের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করে। এরপর প্রতি বছর উন্মুক্ত দরপত্রে এই ঘাট ও পার্কিং ইজারা দেওয়ার কথা। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, আদালতে মামলা থাকায় গত দুই অর্থবছরে নতুন করে ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পুরোনো ইজারার মেয়াদ মাসে মাসে বাড়ানো হচ্ছে। এই সুযোগেই অতিরিক্ত টাকা আদায় চলছে বলে অভিযোগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কিং ইয়ার্ডের ভেতরে রিকশা মেরামতের দোকানে বসে টাকা গুনছেন সোহরাব হোসেন। তিনি নিজেকে ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা পরিচয় দিয়ে বলেন, তারা ছয়জন টাকা তুলে ওপর মহলে পাঠিয়ে দেন। দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন তারা। তবে কে ইজারাদার তা বলতে রাজি হননি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সোহরাবসহ মুন্না, কবীর হোসেন ও শাহীন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রাক আসে এই পার্কিংয়ে। প্রতি ট্রাকে দুই হাজার টাকা হিসেবে দিনে তিন লাখ টাকা চাঁদা ওঠে। মাসে যা প্রায় ৯০ লাখ টাকা। খালি ট্রাকসহ মিলিয়ে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া পার্কিংয়ের ভেতরে থাকা ৭০টি চা-খাবারের দোকান থেকে দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানমালিক জানান, বেচাবিক্রি হোক বা না হোক, প্রতিদিন বেলা ১১টায় ৩০০ টাকা দিতে হয়। না দিলে দোকান তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল করিম ৯৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য পার্কিং ইজারা নেন। ৫ আগস্টের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর নিয়ন্ত্রণ নেন শ্রমিক দল ও যুবদলের কয়েকজন নেতা।

নতুন দরপত্রের সময় ঘনিয়ে এলে করিম হাজির পক্ষে মামলা করা হয়। ফলে দরপত্র আহ্বান করা যাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সাল থেকে ইজারার মেয়াদ এক মাস করে বাড়ানো হচ্ছে। মামলা নিষ্পত্তি হলেই নতুন ইজারা দেওয়া যাবে।

চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে যে তিনজন নেতার নাম জানা গেছে তারা হলেন— ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সুমন ভূঁইয়া, কোতোয়ালি থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহমেদ হোসেন সোবহান এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল হাওলাদার।

সুমন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, করিম হাজি পালানোর পর সবকিছু তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং বিআইডব্লিউটিএকেও জানিয়ে দিয়েছেন। মাসিক হাজিরামূল্য দিয়ে তারা পার্কিং পরিচালনা করছেন। তবে করিম হাজি আসলে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়েছেন কি না তা যাচাই করা যায়নি। তার মুঠোফোন বন্ধ।

বাদামতলী ফলের বাজার প্রায় শতবর্ষ পুরোনো। ১৯৩৫ সালে চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী হাতে গোড়াপত্তন হয়। এখন প্রতিদিন প্রায় শত কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, চাঁদার কারণে ফলের দাম বেড়ে যায়। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন জুন মাসে পার্কিং খরচ কমানোর কথা বলেছিলেন, কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়তদার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, পার্কিং ফিসহ সব খরচ ফলের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাই অতিরিক্ত ফি মানেই ফলের দাম বেড়ে যাওয়া।