পুরোনো ও জরাজীর্ণ পাইপলাইনের ছিদ্রপথে পানি প্রবেশের কারণে ঢাকা নগরীর একাধিক এলাকায় রান্নার গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তিতাস গ্যাস কোম্পানির সূত্র জানায়, সাড়ে তিন দশকেরও বেশি পুরোনো এসব পাইপলাইন বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন খননকাজের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বর্ষার জলাবদ্ধতায় ছিদ্রগুলো দিয়ে পানি ঢুকে গ্যাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এলাকার বাসিন্দা খান মো. রবিউল আলম প্রথম আলোকে জানান, পাইপে পানি ঢোকায় গত এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের বাড়িতে গ্যাস নেই। সন্তানদের নিয়ে রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফেসবুকের ‘আমরা মোহাম্মদপুরবাসী’ গ্রুপে শারমীন আফরোজ নামে এক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেন, আগে বেলা তিনটায় গ্যাস পেলেও এখন চুলা চালু করাই যাচ্ছে না। পোস্টের কমেন্টে আরও অনেকে অনুরূপ বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেছেন।

পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, তিতাস, সিলেটের জালালাবাদ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী বিতরণ কোম্পানির অধিকাংশ পাইপলাইনের বয়স ৩৫ বছরের ঊর্ধ্বে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে গ্যাস লিকেজ বাড়ছে। তিতাসের কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে প্রতিমাসে গড়ে ৭০০ অভিযোগ আসে, যার সিংহভাগই লিকেজ সংক্রান্ত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৯০০টি লিকেজের অভিযোগ রেকর্ড করা হয়। গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল ২ হাজার ২৭৪টি, আর নিম্ন চাপের অভিযোগ ছিল ২৫২টি।

তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) কাজী সাইদুল হাসান বলেন, পুরোনো পাইপলাইন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজের কারণে বৃষ্টির পানি ঢুকে সরবরাহে বি ঘাটাচ্ছে। অভিযোগ পেলে শ্রমিকরা ছিদ্র মেরামত করছেন, তবে ক্ষতিস্থান শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় সময় লাগছে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয় না, ফলে রাতে কাজ করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে জানা যায়, পাইপলাইনে ছিদ্রের ফলে গ্যাস অপচয়ের হারও বাড়ছে। বিতরণ লাইনে বার্ষিক অপচয়ের হার ৭ শতাংশের বেশি, অথচ গ্রহণযোগ্য মাত্রা মোটে ২ শতাংশ। পুরোনো পাইপলাইন, তৃতীয় পক্ষের কাজে ক্ষত এবং আবাসিকে অবৈধ সংযোগকে এই অপচয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। নতুন পাইপলাইন স্থাপনের একটি প্রকল্প থাকলেও বর্তমান সরকার আবাসিক খাতে বড় বিনিয়োগের পক্ষপাতি নয়, শুধু জরুরি মেরামত ও সংস্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেছেন, দীর্ঘ দিনের অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটের কারণে তিতাস এই সংকট মোকাবিলায় অক্ষম। তিতাসের বোর্ডকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির কাছে জবাবদিহি করার কথা থাকলেও তা বাস্তবে হচ্ছে না। সিস্টেম লসের আড়ালে লুটপাটকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলছে।

এর পূর্বে গত ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে তিতাসের প্রধান পাইপলাইন ফেটে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থান দিয়ে পানি ঢুকলে আমিনবাজার থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গ্যাস সংকট ভোগ করতে হয়েছিল নাগরিকদের। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ধারাবাহিক সংকটের মধ্যে প্রায় দেড় দশক ধরে আবাসিক নতুন সংযোগও বন্ধ রয়েছে।