মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত ‘বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রাবন্ধিক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর প্রয়াণ-উত্তর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পর্যালোচনা সভা’য় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি অধ্যাপক ফজলুল হকের প্রাক্তন ছাত্র। স্মৃতিচারণায় মন্ত্রী বলেন, শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি রাজনীতি ও জীবন সম্পর্কেও শিক্ষা লাভ করেছেন তাঁর কাছ থেকে। প্রথমবার মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রিয় শিক্ষকের কাছে আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে অধ্যাপক ফজলুল হকের চিন্তাধারা তুলে ধরে বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্র হবে জনগণের, জনগণই হবে রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি এবং রাষ্ট্রের চরিত্র হবে কল্যাণকর। তিনি একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কোনো কোনো মৃত্যু পালকের মতো হালকা, আর কোনো মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী। আমার কাছে স্যারের মৃত্যু হিমালয় পর্বতের মতো ভারী।’ মন্ত্রী আরও বলেন, তিনি আধিপত্যবাদী শক্তির বিরোধী ছিলেন এবং এ দেশের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সারা জীবন তিনি এসব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন।

সভায় আলোচকদের অধিকাংশই ছিলেন অধ্যাপক ফজলুল হকের সরাসরি ছাত্র বা ছাত্রসম। সভাপ্রধান ভাষাবিদ অধ্যাপক মনসুর মুসা ছিলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ও সহকর্মী। আলোচনায় উঠে আসে তাঁর শিক্ষকতার বৈশিষ্ট্য, রচনা, চিন্তা, আদর্শ, কর্ম ও জীবনযাপনের বিবিধ দিক। অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, তিনি শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। গ্রিক দার্শনিকদের মতো হাটবাজার ও জনসমাগম স্থানেও তিনি শিক্ষা দিতেন। অধ্যাপক ও গবেষক সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, ফজলুল হক ছিলেন বাংলাদেশপন্থী বুদ্ধিজীবী। পরমত সহিষ্ণুতা ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ গুণ; বিরোধী মতের যুক্তিও তিনি ধৈর্যের সঙ্গে শুনতেন। তিনি ছিলেন নির্বিরোধ স্বভাবের, উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সমকালীনতার পক্ষে।

অধ্যাপক মাহবুব বোরহান বলেন, তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তা বলতেন ও লিখতেন এবং প্রয়োগের চেষ্টা করতেন। অহিংসবাদী ফজলুল হকের ধ্যান, জ্ঞান ও সাধনার বিষয় ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আফজালুল বাসার বলেন, বাংলার ১৯ শতকের জাগরণ, সাহিত্য ও ইতিহাস ছিল তাঁর হাতের তালুর মতো পরিষ্কার; অধ্যাপক আহমদ শরিফ ছাড়া এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় কেউ নেই। পরিবারের পক্ষে মেয়ে অধ্যাপক শুচিতা শরমিন বলেন, শৈশব থেকে তিনি দেখেছেন বাবা সারা রাত পড়ালেখা করতেন। তিনি অত্যন্ত অনাড়ম্বর ও সহজ জীবন যাপন করতেন, কোনো পদের লোভ ছিল না।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, যথার্থভাবেই আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী, যার দৃষ্টিভঙ্গি উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী ছিল। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর চিন্তা ও বিশ্বাসের প্রতি অটল ছিলেন। সভাপ্রধানের বক্তব্যে অধ্যাপক মনসুর মুসা সহপাঠী হারানোর ব্যক্তিগত শোক প্রকাশ করে তাঁর সব রচনা সহজলভ্য করতে রচনাবলি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৫ জুলাই পরলোক গমন করেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।