ম্যানহাটনের মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক জ্যানেট ভার্গাস শুক্রবার এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত অভিবাসন নীতিকে বাতিল ঘোষণা করেছেন। সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিয়োগপ্রাপ্ত এই বিচারক বলেন, জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর থাকা ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ মোট ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল। আদালতের মতে, পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষিত ওই নীতি ‘স্পষ্টতই বেআইনি’ এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

রায়ে বিচারক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, অভিবাসী ভিসার আবেদন যাচাইয়ের ক্ষমতা আইনত কনস্যুলার কর্মকর্তাদের হাতে। আইনে এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এখতিয়ার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু জানুয়ারিতে ঘোষিত নীতির মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন দপ্তর ওই আইনি কাঠামো অতিক্রম করেছে। ভার্গাস তাঁর রায়ে আরও বলেন, আবেদনকারীর জাতীয়তার ভিত্তিতে ঢালাওভাবে অভিবাসী ভিসা দেওয়া বন্ধ করার এ পদ্ধতি প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে এমন ব্যাপক প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যেসব দেশের নাগরিকরা এই স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েছিলেন, তাদের মধ্যে লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ে; বলকান অঞ্চলের বসনিয়া ও আলবেনিয়া; এবং দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ছিল। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বহু দেশও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তখন যুক্তি দেখিয়েছিল, এসব দেশের আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে সরকারি ভাতা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কিংবা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ কারণেই তাদের অভিবাসন অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।

এই মামলাটি দায়ের করেছিল অভিবাসী অধিকার নিয়ে কর্মরত ‘ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক’ ও ‘আফ্রিকান কমিউনিটিজ টুগেদার’ নামের দুটি সংগঠন। তাদের সঙ্গে ছিলেন তালিকাভুক্ত ৭৫ দেশের ভিসা আবেদনকারী নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তাদের পরিবারের সদস্যরা, যারা স্বজনদের নিয়ে আসার জন্য অভিবাসী ভিসার আবেদন করেছিলেন। আদালত তাদের পক্ষে এই রায় প্রদান করেন। উল্লেখ্য, মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে ভিসা আবেদন যাচাই করে কোনো আবেদনকারীকে অনুমোদন দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সাধারণত সংশ্লিষ্ট ভিসা কর্মকর্তারাই নিয়ে থাকেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। প্রশাসনের দাবি, এসব পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ রায়ের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।

এই নীতি বাতিলের ফলে বাংলাদেশসহ বহু দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া পুনরায় স্বাভাবিক পথে ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। লাখো বাংলাদেশি আবেদনকারী এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে সরাসরি উপকৃত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।