দেশের গ্যাস খাতে দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতি চলছেই। এই ঘাটতি পূরণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিকল্প নেই বলেই মনে করছে সরকার, তবে আমদানি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা প্রকট। বর্তমানে কেবল দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল অবস্থা। যেকোনো একটি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে পড়লে শুধু গ্যাস সরবরাহই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প কারখানার কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়ে। সম্প্রতি একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে সেই সংকটের রূপ স্পষ্ট দেখা গেছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বিকল্প টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি মেরামতের কাজ চলছে, তবে চালু করতে গেলে টার্মিনালটিকে ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে বলে আগে ধারণা করা হচ্ছিল। ফলে সরবরাহ আবারও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কর্তৃপক্ষ এখন যৌক্তিক সমাধানের পথ খুঁজছে; টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ না করেই বয়লারটি চালু করা সম্ভব কি-না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ সফল হলে সংকট অনেকটাই লাঘব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, টার্মিনাল চালুর আগেই এলএনজি বহনকারী বিকল্প জাহাজ প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সরবরাহে আর কোনো বিঘ্ন না ঘটে। টার্মিনাল বন্ধ থাকাকালে যেসব সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি ছিল, তাদের বারবার পরিস্থিতি জানানোয় সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন টার্মিনাল পুরোদমে চালু হলে নতুন করে সমন্বয় করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
সামিট টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট আংশিকভাবে চালু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও অন্তত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন কর্মকর্তারা। এতে একটি টার্মিনাল অকেজো হলেও অন্যগুলোর মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যাবে। স্থলভাগে একটি টার্মিনাল নির্মাণের জন্যও পরামর্শক নিয়োগের কাজ প্রায় শেষ। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, কেবল টার্মিনালের সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; গ্যাস আমদানির উৎস, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা এবং পাইপলাইন অবকাঠামো — সবকিছুকে সমন্বিতভাবে দেখা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশীয় গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো। বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয় বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা, পরিবহন ব্যয় এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
সেজন্য স্থলভাগে অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোরও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।




