বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য তৈরি করে নজির গড়েছেন মাগুরার জাগলা এলাকার আঙ্গারদাহ গ্রামের উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড’-এ পেঁপের নল, আম ও নিমগাছের চিকন ডাল, শজনের ডাঁটা-পাতা, নারকেলের ছোবড়া কিংবা পাকচং ঘাসের মতো স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে পোষা প্রাণীর খাবার, পোশাক ও খেলনা মিলিয়ে ৪০০ রকমের পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্য উন্নত বিশ্বের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা ধরে)। রপ্তানির গন্তব্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে জাপান। এছাড়া কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও পণ্য পাঠানো হচ্ছে।
মাগুরা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে আঙ্গারদাহ গ্রামে ২৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটিতে কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়ার মতো। সেখানে শত শত নারী শ্রমিক সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করছেন। কেউ কাপড় ও চামড়া দিয়ে কুকুরের আকর্ষণীয় বেল্ট তৈরি করছেন, কেউ বা নিপুণ হাতে ঘাস বুনে পাখির শৈল্পিক বাসা বানাচ্ছেন। আবার কেউ দলবেঁধে ঘাস, শজনের ডাল ও পাতা শুকানোর কাজে ব্যস্ত। কারখানাটিতে চারটি ভাগ রয়েছে। একটিতে পোষা প্রাণীর পোশাক, অন্যটিতে কুকুর-বিড়ালের খেলনা তৈরি হয়। তৃতীয় অংশে পোষা প্রাণীর খাবার ও স্ন্যাকস তৈরি করা হয়, আর চতুর্থ অংশটি ঘাসের কারখানা, যেখানে খরগোশ, গিনিপিগ ও ইঁদুরের খেলনা এবং খাবার উৎপাদিত হয়।
পেঁপের নল প্রক্রিয়াজাত করে খরগোশ, গিনিপিগ ও হ্যামস্টারের খাবার বানানো হয়। পোষা কুকুরের দাঁত পরিষ্কারের জন্য নিমের ডাল ব্যবহার করা হয়, যা কুকুর চিবিয়ে ফেললে দাঁত পরিষ্কার হয়ে যায়। কানাডায় রপ্তানি হচ্ছে ঘাস দিয়ে তৈরি ইঁদুরের ঘর।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে সাউয়াদা ইসলাম সেখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরে পারিবারিক কারণে জাপানে পাড়ি জমান। তবে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, যে মাটিতে মানুষের জন্ম, সেই মাটির প্রতি বিশাল ঋণ তৈরি হয়। আর সেই ঋণ শোধের শ্রেষ্ঠ উপায় হলো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। কাউকে মাছ না দিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা শেখানোর দর্শন এবং বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার পাশে থাকার তাাড়না থেকেই তিনি জন্মস্থানে ফিরে আসেন। পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই এদের খাবার ও খেলনা তৈরির ভাবনা মাথায় আসে।
২০১৮ সালে মাত্র চার-পাঁচজন কর্মী ও দুই ধরনের খেলনা দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। ওই বছরেই প্রথম চালানে জাপানে তিন হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। চাহিদা বাড়তে থাকায় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মী নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। সাউয়াদা ইসলামের সাফল্য দেখে জাপান ও সিঙ্গাপুরের দুটি প্রতিষ্ঠান এই কারখানায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে।
বর্তমানে কারখানায় ২০০ নারী সরাসরি কর্মরত, যাঁদের জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। এছাড়া আরও ৩০০ নারী বাড়িতে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেন। কাঁচামাল সংগ্রহেও গ্রামবাসী যুক্ত। শতাধিক মানুষ পেঁপের নল, আম-নিমের ডাল কিংবা ঘাস কুড়িয়ে কারখানায় নিয়ে আসেন এবং নগদ টাকা পান। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা সুপ্রিয়া রানী জানান, এখানে কাজ করে তিনি জমি কিনেছেন, বাড়ি করেছেন এবং সংসারের অনেক চাহিদা পূরণ হয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাড়িতে থেকেই চাকরি করা যাচ্ছে।
সাউয়াদা ইসলাম মনে করেন, বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনার বিশাল বাজার রয়েছে, যার বড় অংশ এখন ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের দখলে। বাংলাদেশ প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে প্রতিটি জেলায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। বিশ্ববাজারের বিশাল চাহিদা পূরণে সারা দেশে অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।




