দেশের গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলো এখন চরম সংকটের মুখে। প্রায় এক মাস ধরে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও গত সপ্তাহে তা তীব্র আকার ধারণ করে। এর ফলে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ১০০টিরও বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব কারখানার মধ্যে বড় শিল্পগোষ্ঠীর অর্ধশতাধিক কারখানা রয়েছে, যার একটি বড় অংশ নিত্যপণ্য উৎপাদনকারী। এছাড়া আরও দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যার বেশিরভাগই নিত্যপণ্যের কারখানা। চালু থাকা কারখানাগুলোতেও উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম। একই অবস্থা টি কে গ্রুপের। তাদের ২৮টি কারখানার মধ্যে বেশিরভাগই বন্ধ, ঢাকার আশপাশে মাত্র একটি কারখানা সীমিত পরিসরে চালু আছে। গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, বিদ্যুৎনির্ভর কারখানাগুলোতেও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান জানান, তাদের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। বিদ্যুৎ সমস্যার পাশাপাশি গ্যাস না থাকায় জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না, ফলে বয়লারনির্ভর কারখানায় উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সিটি গ্রুপের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সৈয়দ রফিকুর রহমান জানান, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। একটি প্ল্যান্ট বন্ধ রেখে অন্যটি চালিয়ে কোনো রকমে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ পাইকারি বাজারে গত তিন দিনে কোনো চিনির ট্রাক ঢোকেনি। ফলে চিনির দাম কেজিতে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মেঘনা গ্রুপের ভোজ্যতেল কারখানায়ও তিন দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যার দৈনিক সক্ষমতা ২ হাজার ৫০০ টন। সিটি এডিবল অয়েলের উৎপাদনও ২ হাজার ৫০০ টন থেকে কমে প্রায় ১ হাজার টনে নেমেছে।
উৎপাদন সংকটের মধ্যে বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কোম্পানিগুলো এখন গুদামে থাকা মজুত পণ্য ব্যবহার করছে। তবে সংকট কত দিন চলবে তা নিশ্চিত না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান 'রেশনিং' পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ শুরু করেছে। এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, বাজার যাতে হঠাৎ খালি না হয়ে যায় সেজন্য পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। টি কে গ্রুপের পরিচালক সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি ৮-১০ দিনের বেশি স্থায়ী হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সিরামিক খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকস গত বুধবার থেকে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, গ্যাস ছাড়া উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব নয়। ইস্পাত উৎপাদনকারী বিএসআরএমের কারখানাতেও গ্যাস সংযোগ বন্ধ, তবে তারা ডিজেল ব্যবহার করে অর্ধেকের কম ক্ষমতায় উৎপাদন চালু রেখেছে। ওষুধ খাতেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের দুটি কারখানা ডিজেল দিয়ে চালানো হচ্ছে, তবে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, হাতে থাকা ডিজেল দিয়ে মাত্র একদিন উৎপাদন চালানো যাবে।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, ফলে সেখানে অন্তত ৩৫টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চারটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। নরসিংদীতে টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের ৯০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে গড় উৎপাদন মাত্র ১০ শতাংশে নেমেছে। সাভারের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হলেও কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি, তবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। হবিগঞ্জে শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস সংকটে ভুগছে, যার অর্ধেকের বেশি রপ্তানিমুখী। খুলনার মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে, ফলে সংরক্ষণ ব্যয় বেড়ে গেছে।
এদিকে টানা ২৫ দিনের সংকটের পর গতকাল গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল পুরোদমে ও এক্সিলারেট এনার্জি আংশিক চালু হওয়ায় ভোর থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। গত শুক্রবার বিকেলে সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এলেও শনিবার সন্ধ্যায় তা ২৪৪ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছে। তবে স্বাভাবিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের তুলনায় এখনো ২৬ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।




