তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইয়েনের মান বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ হস্তক্ষেপ বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে প্রত্যাশিত স্বস্তি আনতে পারেনি। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইয়েন ক্রয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যদিকে জাপানের পক্ষ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিমাণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য প্রায় ১৬৪ থেকে বেড়ে ১৫৭ ইয়েনে পৌঁছালেও, পরবর্তী সময়ে সেই লাভ কিছুটা হারিয়ে শুক্রবার প্রায় ১৫৯ ইয়েনের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েনকে শক্তিশালী করার এই প্রচেষ্টা মূলত সমস্যার মূল কারণ নয়, বরং উপসর্গ প্রশমনের স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা মাত্র। জাপানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২০০ শতাংশের বেশি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়াবে এমন আর্থিক উদ্দীপনা, এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যেও সুদের হার বাড়াতে ধীরগতির কেন্দ্রীয় ব্যাংক — এই সবকিছুই ইয়েনের দুর্বলতার অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। সম্প্রতি ইয়েনের অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্র-জাপান যৌথ হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটাতে বাধ্য করেছে, যা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ইয়েনের অবস্থানকে আগের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ওয়াল স্ট্রিটের অভিজ্ঞ বিশ্লেষক এড ইয়ারডেনি তার নোটে উল্লেখ করেছেন, বর্তমানে বাজার ‘ইয়েন ক্যারি ট্রেড’ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই ব্যবস্থায় সস্তা ইয়েন ধার করে সারা বিশ্বের উচ্চ-ফলনশীল সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়। ইয়ারডেনির ভাষায়, “সমগ্র আর্থিক ব্যবস্থা এখন এক বিশাল জেঙ্গা টাওয়ারের মতো, যেখানে ইয়েন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারবহনকারী খুঁটি হিসেবে কাজ করছে।” এই টাওয়ারের কোনো খুঁটি টেনে বের করলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের হস্তক্ষেপের কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, ডলারের বদলে ইউরো বিক্রি করে ইয়েন কেনা এবং নিজেদের ট্রেজারি হোল্ডিং বিক্রি না করে সেগুলো বন্ধক রেখে অর্থ সংগ্রহ — এই দুটি বিষয় ডলারের আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইয়েনের পতন মার্কিন ঋণের দৃষ্টিভঙ্গি আরও খারাপ করতে পারে — এমন আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপ নিয়েছে। জাপান ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ট্রেজারি মজুদ রেখে বিদেশি ঋণদাতাদের মধ্যে শীর্ষ স্থানে থাকায়, এই রিজার্ভ ব্যবহার করলে মার্কিন ট্রেজারির ফলন বেড়ে যাবে এবং দেশটির ঋণের খরচ আরও বাড়বে। এশিয়ার অন্যান্য দেশও ট্রেজারি বিক্রি করতে পারে। তবে ইয়ারডেনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৯৮ সালের এশিয়ান আর্থিক সংকটের সময়ের তুলনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা এখন অনেক ভালো।
উল্লেখ্য, মার্কিন মুদ্রাস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে কম আসায় ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমেছে, তারপরও হস্তক্ষেপের পর ইয়েনের দরপতন অব্যাহত থাকা একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত। এর আগে জাপান ব্যাংকের সুদের হার বাড়াতে অনীহা এবং ফেডের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা ইয়েনের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবিন ব্রুকস ‘দ্য ইয়েন ইজ ইন ডিপ ট্রাবল’ শিরোনামের এক পোস্টে বলেছেন, মার্কিন ও জাপানের সুদের হারের ব্যবধান কমার কথা ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইয়েনের পতন অব্যাহত থাকা সত্যিই একটি দুশ্চিন্তার বিষয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে ইয়েনের এই ধারাবাহিক পতন আসলে একটি সুপ্ত ঋণ সংকটের লক্ষণ। তার মতে, বাজার হস্তক্ষেপকে উপেক্ষা করবে এবং এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হতে বাধ্য, কারণ এটি কেবল স্থিতিশীলতার একটি মায়া তৈরি করে।
ব্রুকস জাপান ব্যাংকের নীতিতে ‘গভীর পরিবর্তনের’ আহ্বান জানিয়েছেন, যা বেঞ্চমার্ক সুদের হারে সামান্য বৃদ্ধির বাইরে যেতে হবে। জাপানি সরকারি বন্ডের দীর্ঘমেয়াদি ফলন বাড়াতে হবে যাতে মার্কিন ফলনের সঙ্গে ব্যবধান কমে আসে এবং ইয়েনের ওপর থেকে চাপ কমে। তিনি বলেছেন, জাপান ব্যাংকের সরকারি বন্ড কেনার পরিমাণ কমাতে হবে, কারণ এটিই ইয়েনকে শক্তিশালী করার একমাত্র উপায়।




