প্রথম আলোর ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয়’ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে রকিবুল হাসানের জীবনের সেই অধ্যায়গুলো, যা শুধু ক্রিকেট নয়, একটি জাতির জন্মের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হকের সঙ্গে আলাপে তিনি ফিরে যান ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের সংগ্রামের দিকে।
১৯৬৯ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পা রাখার সময় তিনি সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। ইস্ট পাকিস্তান দলে ওপেনার হওয়ার জন্য চারজনের মধ্যে লড়াই চলছিল। নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না সুযোগ পাবেন কিনা। তবু সুযোগ এল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে অল পাকিস্তান টেস্ট দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন তিনি। সেই সময়ের সাদামাটা জীবনের কথাও স্মরণ করেন—একটি মাত্র প্যান্ট ছিল তাঁর; প্যান্ট না থাকলে পায়জামা পরে অনুশীলন করতেন। করাচি যাওয়ার কথা শুনে প্রথমবারের মতো বিমানে চড়ার উত্তেজনার পাশাপাশি ম্যাট্রিক পরীক্ষার চিন্তাও ছিল। পুলিশ সুপার বাবা প্রথমে হয়তো যেতে দেবেন না—এমন আশঙ্কা ছিল। কিন্তু বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরে ইংরেজিতে বললেন, তিনি অত্যন্ত গর্বিত। হাতে তুলে দিলেন ৩০০ রুপি এবং বললেন ভালো খেলতে। সেই সময় সংসার ছিল অত্যন্ত সাধারণ; একটি প্যান্টের অভাবে পায়জামা পরে প্র্যাকটিস করতে হতো।
সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের স্মৃতি তাঁর কাছে কেবল শিক্ষার নয়, শৃঙ্খলা ও মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষারও কেন্দ্র। সেখান থেকেই উঠে আসে শহীদ আজাদ, শহীদ জুয়েল ও কাজী কামালদের নাম। তাঁর বড় ভাইয়ের সহপাঠী ছিলেন আজাদ; তাঁদের বাসায় আসতেন আজাদ ভাই। শহীদ আজাদের মায়ের হৃদয়বিদারক কাহিনি তাঁর মায়ের বইয়ে পড়েছেন—ছেলে শেষবার বলেছিল ‘মা, ভাত আনো’, কিন্তু ফিরে এসে মা আর ছেলেকে পাননি। এরপর আজীবন তিনি ভাত খাননি। জুয়েলের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। করাচিতে একটি ম্যাচের আগে দল ঘোষণা হওয়ার কথা। সবাই ধরে নিয়েছিল, কনিষ্ঠ হিসেবে তিনিই দ্বাদশ হবেন। কিন্তু দেখা গেল, জুয়েল দ্বাদশ খেলোয়াড়, রকিবুল একাদশে। জুয়েল নামগুলো পড়ে শোনানোর পর তাঁকে বললেন, ব্যাট নিয়ে নেটে যেতে—কারণ তিনি ওপেন করবেন। নিজের জায়গা ছেড়েও সতীর্থকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন জুয়েল। রকিবুল বললেন, এই ছিল জুয়েল।
১৯৭১ সালের সেই বিখ্যাত ঘটনাও উঠে আসে। কমনওয়েলথ একাদশের বিপক্ষে পাকিস্তান দলের হয়ে খেলতে নেমে নিজের ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নামেন তিনি। অলিম্পিকের ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলনের ছবি তাঁর মাথায় ছিল; তাই মনে হয়েছিল, কিছু একটা করতে হবে। তবে তখন ভাবেননি, এর জন্য এত বড় মূল্য দিতে হবে। ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’ তালিকায় তাঁর নাম উঠে যায়। এক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা গোপনে খবর পাঠিয়েছিলেন—ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে, না হলে হত্যা করা হবে। ঢাকা ছেড়ে তিনি গ্রামে যান। পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট দল গঠনের উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের আরও একটি স্মৃতি তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। আজাদ বয়েজ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা মুশতাককে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে। তাঁর মরদেহ নিজের চোখে দেখেছিলেন রকিবুল। মা-বাবার মৃত্যুতেও কাঁদেননি তিনি, কিন্তু মুশতাককে যেভাবে পড়ে থাকতে দেখলেন, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। মুশতাক ছিলেন তাঁর ক্রিকেট-জীবনের পথপ্রদর্শক।
স্বাধীনতার পর আবার ক্রিকেট শুরু হয়। তখন অনেকে এটিকে ‘বড়লোকের খেলা’ বলে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয় এবং খেলা পুনরায় শুরু হয়। আজকের বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে তাঁর গর্ব আছে—সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের মাধ্যমে বিশ্বে পরিচিতি। তবে ধারাবাহিকতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেন। তাঁর মতে, বড় বড় স্টেডিয়ামের চেয়ে খেলার মাঠ বেশি দরকার। স্কুল ক্রিকেটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সবশেষে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর আবেদন—সন্তানের হাতে মোবাইলের পরিবর্তে ক্রিকেট ব্যাট তুলে দিন। ক্রিকেটকে ভালোবাসুন। তাঁর বিশ্বাস, বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ জিতবেই।




