বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট থেকে ছুটি পেয়ে ২১ দিনের একটি নবজাতককে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে তার পরিবার। হামের সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর এখন পুরোপুরি সুস্থ সে। শিশুটির বাবার মুখে এখন স্বস্তির হাসি; পাশে স্ত্রী ব্যাগ গোছাচ্ছেন—সবচেয়ে বড় আনন্দ এখন সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় ঘরে নিয়ে যাওয়া।

গত ১৪ জুলাই শরীয়তপুরের একটি হাসপাতালে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের মাত্র দশ দিনের মাথায় হামে আক্রান্ত হন তার মা। সেই সংক্রমণই ছড়িয়ে পড়ে নবজাতকের শরীরেও। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করানো হলেও অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ১ আগস্ট শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরদিনই গুরুতর অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অবস্থার উন্নতি হলে তাকে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে (এ ব্লকের ২ নম্বর ওয়ার্ড) স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসা সম্পন্ন করে আজ ছাড়পত্র পেয়েছে পরিবার।

এই সংক্রমণের উৎস ছিল শিশুটির মা নিজেই। ২০১১ সালে জন্ম নেওয়া ওই তরুণীর বয়স এখন ১৫ বছর। সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র দশ দিনের মাথায় তিনি হামে আক্রান্ত হন। এর আগে কখনো হামের টিকা দূরে থাক, অন্য কোনো টিকাও নেওয়া হয়নি তার। ছোটবেলায় টিকা না পাওয়ার কারণ হিসেবে চরাঞ্চলে বসবাস ও সময়মতো পৌঁছাতে না পারার কথা জানিয়েছেন শিশুটির নানি। নদীভাঙনে সব হারিয়ে বরিশালের হিজলা উপজেলা থেকে শরীয়তপুরের চর মাইজারী এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে পরিবারটি।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাচ্চাটির বয়স মাত্র ২১ দিন হওয়ায় প্রথম দিন থেকেই বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট খারাপ আসায় আইসিইউতে নেওয়া হয়। তৃতীয় দিনের মাথায় উন্নতির লক্ষণ দেখা দেয়। পুরোপুরি সেরে ওঠার পর আজ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

অর্থনৈতিক সংকটও পিছু ছাড়েনি পরিবারকে। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান শিশুটির বাবা। একসময় বরিশালের হিজলা উপজেলায় বাড়ি ছিল তাদের; নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে চলে আসেন চরাঞ্চলে। স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে এক লাখ টাকার বেশি ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। তবু হাসপাতালের বেডে সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকার সময় ঋণের চিন্তা যেন কিছুটা আড়ালে ছিল। টাকা গেলেও দুঃখ নেই, বাচ্চাটি সুস্থ—এই ছিল তার কথা।

নিজে বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি এই বাবা। চার ভাই ও তিন বোনের সংসারে ছোটবেলাতেই বাবার সঙ্গে কাজে নামতে হয়েছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নিজের সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর তার মনে হয়েছে, জ্ঞানের গুরুত্ব কতখানি। হাসপাতালের ডাক্তারদের সেবায় মুগ্ধ হয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিজে পড়াশোনা করতে না পারার কারণে সন্তানের দেখভালের অনেক কিছুই জানতেন না। যার ফলে সন্তান ও স্ত্রীর এমন বড় বিপদ চলে আসে। যত কষ্টই হোক, সন্তানকে লেখাপড়া শেখাবেন; বড় হয়ে যেন ডাক্তার হয়ে সবার চিকিৎসা করতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত নবজাতকরা মায়ের শরীর থেকে হাম প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সেই কারণেই নয় মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হাম টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছরে নয় মাসের কম বয়সী অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। মাত্র ২১ দিনের একটি নবজাতকের হাম আক্রান্ত হওয়া তাই চিকিৎসকদের কাছেও ব্যতিক্রমী ঘটনা। এই শিশুর ক্ষেত্রে সংক্রমণের উৎস তার টিকাহীন কিশোরী মা—যা এই রোগের বিস্তারে টিকাদানের গুরুত্বকে আবারও সামনে এনেছে।