বাংলাদেশে হামের প্রকোপ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ছয় মাসের কম বয়সী অনেক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া মোট শিশুর মধ্যে ১৮ শতাংশেরই বয়স ছয় মাসের নিচে। এই পরিসংখ্যান উদ্বেগ ছড়িয়েছে রোগতত্ত্ববিদ ও শিশু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
একসময় প্রচলিত ধারণা ছিল, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিরোধক্ষমতা ও মায়ের দুধ শিশুদের হামের মতো রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখে। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই দেশে ৯ মাস বয়স থেকে হামের টিকা দেওয়া হতো। তবে সম্প্রতি রোগতত্ত্ববিদদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সীরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই এ বছরের শুরুর দিকে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইনে ছয় মাস বয়সীদেরও টিকার আওতায় আনা হয়। কিন্তু বর্তমান তথ্য বলছে, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামের শিকার হচ্ছে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিরোধক্ষমতা এবং বুকের দুধ আগে শিশুদের সুরক্ষা দিত। কিন্তু ছয় মাসের কম বয়সীদের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, এখন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের সময় এসেছে।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্যানুযায়ী, এ বছর দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭১০ জন। নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৮ জনের। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৫ জন। গতকাল এক দিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্যে কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল ১৮ জুলাই পর্যন্ত এই হাসপাতালে দেশের ৫৩টি জেলা থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৭৭০ শিশু। এদের মধ্যে ৩৩৪ জনের বয়স ছয় মাসের কম, আর ১৯২ জনের বয়স পাঁচ বছরের বেশি। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া ৩৬৮ জনের মধ্যে ৬৬ জনের বয়স ছয় মাসের নিচে, আর ৩৬ জনের বয়স পাঁচ বছরের উপরে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে, দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। এ বছরের ক্যাম্পেইনে টিকা দেওয়া হয়েছে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের। কিন্তু হাসপাতালের তথ্য বলছে, এই বয়সসীমার বাইরেও প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যার মধ্যে ছয় মাসের কম ও পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশু রয়েছে।
এদিকে হামে আক্রান্ত চার মাসের শিশু নাহিদকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে না পেরে মহাখালী এলাকায় অসহায় অবস্থায় বসে আছেন তার মা। এমন ঘটনা দেশের হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান টিকাদান কৌশল পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে আরও গবেষণা জরুরি।




