ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে লোকসভার বাদল অধিবেশনকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক। রোববার অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) নামের একটি অচেনা দলকে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দলগুলো। দলটি সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে আসা ২০ জন সংসদ সদস্যের নতুন ঠিকানা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈঠকে এনসিপিআইয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেখে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরা প্রথমে ওয়াকআউট করেন। তাদের অনুসরণ করে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, সিপিএম, ডিএমকে ও আম আদমি পার্টির প্রতিনিধিরাও বৈঠক ত্যাগ করেন। তবে এই ওয়াকআউট ছিল প্রতীকী; অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ফিরে আসেন।
ঘটনার পটভূমি বলতে গেলে দেখা যায়, গত এপ্রিলের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়ে। লোকসভায় দলের ২০ জন সদস্য দলত্যাগের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে ১৭ জন আইনসভায় এনসিপিআইয়ের পক্ষে কাজ করার কথা জানিয়ে স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দেন। এখন পর্যন্ত স্পিকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। লোকসভার ওয়েবসাইটে এখনো তৃণমূলের সংসদ সদস্য সংখ্যা ২৮ দেখাচ্ছে।
শনিবার সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লেখেন। তাতে তাকে এনসিপিআই নেতা হিসেবে উল্লেখ করে রোববারের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে দলটির চিফ হুইপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মাধ্যমে কার্যত এনসিপিআইকে লোকসভার একটি স্বতন্ত্র দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূল নেতারা এটিকে ‘গণতন্ত্রের উপহাস’ বলে অভিহিত করেছেন। রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘প্রতারণা। গণতন্ত্রকে উপহাস করা হচ্ছে। স্পিকার এখনো ওই ২০ জন বিশ্বাসঘাতককে তৃণমূলের সাংসদ হিসেবে উল্লেখ করছেন...আর মন্ত্রী তাদের সর্বদলীয় বৈঠকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন এবং এনসিপিআই দলের এমপি হিসেবে উল্লেখ করছেন।’
এনসিপিআই ২০২৩ সালে গঠিত হলেও সম্প্রতি পর্যন্ত এটি তেমন পরিচিত ছিল না। গত মাসে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা এতে যোগ দিলে দলটির অস্তিত্ব আলোচনায় আসে। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বিদ্রোহীরা নিজেরাই জানিয়েছেন তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলের অংশ নন; বরং এনসিপিআইয়ের সংসদীয় দল হিসেবে কাজ করছেন। সর্বদলীয় বৈঠকের উদ্দেশ্য সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব পক্ষের মতামত শোনা—এমন যুক্তিতেই তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তৃণমূলের বিদ্রোহীদের স্বীকৃতির আবেদন স্পিকারের বিবেচনাধীন রয়েছে এবং যথাসময়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
শনিবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও দেখা করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। লোকসভা সচিবালয়ের প্রকাশিত এক নথিতে তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদকে দলের বাকি আটজন সদস্য থেকে আলাদা বসার কথা বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের এই পদক্ষেপ একটি জোরালো ইঙ্গিত যে বাদল অধিবেশন শুরুর আগেই দলটি অনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে পারে। ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন তারা।
একই নথিতে মহারাষ্ট্রের শিবসেনার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর জন্যও স্বীকৃতির বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে উদ্ধব ঠাকরের দল থেকে আসা ছয়জন সাংসদের মিশে যাওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের মতো মহারাষ্ট্রের শিবসেনাও ভাঙনের মুখে পড়ল—এমন মন্তব্য করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।




