৩৯ বছর বয়সে পা রেখেও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের জাদু অব্যাহত রেখেছেন লিওনেল মেসি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছেন তিনি। এই আসরে ইতিমধ্যেই আট গোল করে ফেলেছেন এই আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। ফুটবলের ইতিহাসে বেশিরভাগ খেলোয়াড় যখন বুটজোড়া তুলে রাখেন, তখনও মেসি উচ্চতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করছেন। তাঁর এই অর্জন অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই মেসিকে ‘সর্বকালের সেরা ফুটবলার’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন অনেকে। আর যাঁরা তাঁকে সবার সেরা মানেন না, তাঁরাও অন্তত ‘সর্বকালের অন্যতম সেরা’ হিসেবে স্বীকার করেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, যাঁদের নাম সর্বকালের সেরা তালিকায় উচ্চারিত হয়, তাঁরা ৩৯ বছর বয়সে কী করছিলেন?

পেলে ৩৭ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। ৩৯ বছর বয়সে তিনি মাঠে ফিরেছিলেন একবার — ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের বিদায়ী ম্যাচে অংশ নিয়ে একটি গোলও করেছিলেন। তবে ওই সময় তিনি মূলত ব্যস্ত ছিলেন সিনেমার শুটিংয়ে। যুদ্ধভিত্তিক ফুটবল সিনেমা ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’র কাজ চলছিল তাঁর। ছবিটি মুক্তি পায় পেলের ৪০ বছর বয়সে। একই সময়ে পেলের নামে একটি ভিডিও গেমও বাজারে আসে।

অন্যদিকে, দিয়েগো ম্যারাডোনাও ৩৭ বছর বয়সে অবসর নিয়েছিলেন। এরপরের সময়টা ছিল তাঁর জন্য বিষাদময়। মাদকাসক্তির কারণে ৩৯ বছর বয়সে আইসিইউতে জীবন নিয়ে লড়তে হয়েছে তাঁকে। পুনর্বাসনের জন্য পরে পাড়ি জমান কিউবায়। এই লড়াইয়ের মাঝেই ২০০০ সালে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম আত্মজীবনী ‘ইও সয় এল ডিয়েগো’।

ইয়োহান ক্রুইফ শুধু মাঠেই নয়, ডাগআউটেও ছিলেন অসাধারণ। ৩৯ বছর বয়সে শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর কিংবদন্তি কোচিং ক্যারিয়ার। ১৯৮৪ সালে ৩৭ বছর বয়সে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন এই ডাচ কিংবদন্তি। পরের বছর আয়াক্সের ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। প্রথম মৌসুমের শেষভাগে তাঁর বয়স ৩৯ ছুঁয়ে যায়। সেবছর লিগে পিএসভির পেছনে থাকলেও তাঁর দল কেএনভিবি কাপ ও ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপ জয় করে।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি। ২০২৪ সালের ইউরোতে পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও তিনি কোনো গোল পাননি। তবে আল-নাসরের হয়ে সৌদি প্রো লিগে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন এই পর্তুগিজ তারকা।

আলফ্রেড্রো ডি স্টেফানো ৩৯ বছর বয়সেও মাঠ মাতিয়েছেন। স্প্যানিশ ক্লাব এস্পানিওলের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ মৌসুম খেলেন তিনি। ৩৩ ম্যাচে করেন ৫ গোল। তবে চার বছর আগেই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে। তিনটি ভিন্ন দেশের হয়ে খেললেও দুর্ভাগ্যবশত কখনো বিশ্বকাপে খেলা হয়নি তাঁর।

ফেরেন্স পুসকাস ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে ৩৯ বছরে পা দেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কোপা দেল রেতে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেন, গোল পান একটিতে। মৌসুম শেষে ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে ওই গ্রীষ্মেই কোচ হিসেবে যোগ দেন হারকিউলিস ক্লাবে। প্রথম মৌসুমে দল রেলিগেটেড হলেও পরবর্তী সময়ে প্যানাথিনাইকোসের হয়ে সফল কোচ হিসেবে নাম কুড়ান।

রোনালদো নাজারিওর প্রতিভা ছিল উল্কার মতো। ১৯৯৭ সালে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অর জেতেন। তবে বারবার ইনজুরি এসে থমকে দেয় তাঁর ক্যারিয়ার। অনেকে তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত স্ট্রাইকার মনে করেন। কিন্তু মাত্র ৩৪ বছর বয়সে করিন্থিয়ানসের হয়ে অবসর নিতে হয়। ৩৯ বছর বয়সে তিনি ফুটবল একাডেমি গড়ার কাজে মনোযোগ দেন — চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ফুটবল স্কুল।

জিনেদিন জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই বিখ্যাত ‘ঢুস’ কাণ্ডের পর মাঠ ছাড়েন। তবে ফুটবল থেকে দূরে যাননি। ৩৯ বছর বয়সে কোচ জোসে মরিনিওর অনুরোধে রিয়াল মাদ্রিদের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হন। সেই মৌসুমে রেকর্ড গড়ে লা লিগা জিতে নেয় মাদ্রিদ। এক বছর পর তিনি কার্লো আনচেলত্তির সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন।

মেসি এখন দাঁড়িয়ে ফাইনালের মঞ্চে। তাঁর সামনে সুযোগ টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের, পাশাপাশি বিশ্বকাপ ফাইনালে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড গড়ার। ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখাতে আর মাত্র একটি ম্যাচ বাকি তাঁর।