নরওয়ের কাছে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন কার্লো আনচেলত্তির ওপর থেকে আস্থা হারায়নি। বরং তাকে ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্ব দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, তার আসল কাজ এখন শুরু। ট্রফি জয়ের বদলে এবার তাকে গড়ে তুলতে হবে সম্পূর্ণ নতুন এক ব্রাজিল দল। আনচেলত্তির ফুটবল দর্শন প্রচলিত ধারণার চেয়ে একেবারে ভিন্ন। বেশির ভাগ কোচ নিজের পছন্দের ফর্মেশন খেলোয়াড়দের ওপর চাপিয়ে দিলেও তিনি বিশ্বাস করেন, হাতে কী ধরনের খেলোয়াড় আছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশল নয়। এই নমনীয়তার কারণেই তিনি ইতিহাসের একমাত্র কোচ হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগেই চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছেন। ড্রেসিংরুমে তাঁর এই নেতৃত্বশৈলীকে বলা হয় 'কোয়ায়েট লিডারশিপ' বা শান্ত নেতৃত্ব। তিনি সেখানে একনায়কের ভূমিকা পালন না করে অভিভাবকের মতো আচরণ করেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একবার মন্তব্য করেছিলেন, তিনি যেন একটি বড় ভালুক, অত্যন্ত শান্ত ও সংবেদনশীল। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো উদ্ধত ফুটবলারও তাঁর সামনে শান্ত হয়ে যেতেন। ট্যাকটিক্যাল কঠোরতা অনেক সময় খেলোয়াড়দের সহজাত প্রতিভাকে নষ্ট করে দেয় বলে মনে করেন আনচেলত্তি। রক্ষণভাগে কঠোর শৃঙ্খলা পছন্দ করলেও, ফাইনাল থার্ডে খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দিতে তিনি পছন্দ করেন। তিনি চান, তারা মাঠে স্বাধীন শিল্পীর মতো ফুটবল উপভোগ করুক। প্রয়োজনের সময় তাঁর দল নিশ্ছিদ্র রক্ষণ গড়ে তোলে, আর প্রতিপক্ষ আক্রমণে উঠে এলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে মেতে ওঠে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন দল পুনর্গঠনে তাঁর ওপর ভরসা রেখেছে। ২০৩০ বিশ্বকাপের লক্ষ্যে আনচেলত্তি ব্রাজিলের ফুটবলকে নতুন করে সাজাতে যাচ্ছেন। নেইমার, কাসিমেরো ও ফাবিনহোর মতো অভিজ্ঞ তারকারা আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য মাঝমাঠে উচ্চমানের পারফর্ম করা নতুন তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করে মাঝমাঠকে তরুণ ও গতিময় করা। নেইমারের বিদায়ের পর ব্রাজিলের আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি সম্ভবত ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের কাঁধে উঠবে। দলের প্রধান চালিকাশক্তি হবেন তিনিই। এনদ্রিক, রদ্রিগো, এস্তেভাও ও রায়ানের মতো ওয়ান্ডারকিডদের আগামী দিনে ব্রাজিলের আক্রমণের মূল অস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। প্রবীণ ডিফেন্ডার দানিলো, মার্কিনিওস বা আলেক্স সান্দ্রোর বিকল্প হিসেবে কাইকি ব্রুনো, ভিতোর রেইস ও নাথানের মতো নতুনদের ব্যাকলাইনে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হবে। গোলরক্ষক আলিসনের জায়গায় নতুন প্রজন্মের গোলরক্ষক তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রক্ষণাত্মক কৌশল ও বল পজেশন ধরে রাখতে না পারার ঘাটতি দূর করতে আনচেলত্তি নতুন ট্যাকটিক্যাল আইডিয়া নিয়ে কাজ করবেন। ব্যাকরুম স্টাফেও বড় পরিবর্তন আসছে। তাঁর সহকারী কোচ ও ছেলে দাভিদে ফ্রান্সের ক্লাব লিলের প্রধান কোচ হিসেবে যোগ দেওয়ায় এবং গোলকিপিং কোচ তাফারেলের সম্ভাব্য পদত্যাগের কারণে নতুন কোচিং প্যানেল দেখা যাবে। ১৯৫৯ সালে উত্তর ইতালির এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া আনচেলত্তির জীবনের শুরুটা রূপকথার মতো ছিল না। তবে মাটির কাছাকাছি বড় হওয়া এই মানুষটি ফুটবল মাঠে সাফল্যের সোনা বুনেছেন। খেলোয়াড় হিসেবে এসি মিলানের হয়ে দুবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতার পর ডাগআউটেও নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রসিক, ভোজনরসিক ও জীবনকে সহজভাবে উপভোগ করেন। আত্মজীবনী 'কোয়ায়েট লিডারশিপ'-এ তিনি লিখেছেন, ফুটবল তাঁর কাছে চাপের কিছু নয়, বরং এক পরম আনন্দের উৎসব। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, প্রিয়জন হারানোর শোক বা ক্লাব ফুটবলের কঠিন চাপ—সবকিছু তিনি সামলেছেন শান্ত স্বভাব ও চুইংগাম চিবানোর চিরসবুজ ভঙ্গিতে। ডাগআউটে তাঁর ইতালিয়ান 'স্প্রেজাতুরা' স্টাইল দারুণভাবে ফুটে ওঠে। আধুনিক ফ্যাশন বদলালেও তিনি নেভি ব্লু বা চারকোল সুট, সাদা শার্ট ও টাইতে অবিচল। চশমা আর ভ্রু কুঁচকানোর ভঙ্গি তাঁর সবচেয়ে বড় ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। ৬৬ বছর বয়সী এই কোচ তাঁর চিরসবুজ সুট-টাই ও চুইংগাম চিবানোর স্টাইলেই বুঝিয়ে দেন—আভিজাত্য কখনো পুরোনো হয় না। আধুনিক ফুটবল ডেটা, হাই-প্রেসিং ও নিখুঁত পজিশনের গোলকধাঁধায় আবদ্ধ হয়ে উঠলেও আনচেলত্তি ফুটবলকে মানবিক রূপে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর দর্শন মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল শেষ পর্যন্ত মানুষের খেলা, রোবটের নয়। সময় বদলায়, ট্যাকটিকস বদলায়, কিন্তু মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাঁর 'ক্ল্যাসিক' দর্শন এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। ব্রাজিলের কঠিন পুনর্গঠনের এই পর্বেও তিনি শুধু একজন সফল কোচ নন, ফুটবলের এক চিরসবুজ চরিত্র।
কার্লো আনচেলত্তি: ফুটবলের চিরসবুজ রূপকার ও ব্রাজিলের নতুন অধ্যায়
ব্রাজিল দলের পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা কার্লো আনচেলত্তি তাঁর শান্ত নেতৃত্ব, খেলোয়াড়কেন্দ্রিক দর্শন ও ক্ল্যাসিক স্টাইলের জন্য পরিচিত। ২০৩০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে নতুন তরুণ প্রতিভা ও কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন এই ইতালিয়ান কোচ।

