বারবার আঘাতের পরও ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প লিখেছেন রাজশাহীর মোস্তাফিজুর রহমান। প্রথমে বাবাকে, তারপর বড় ভাইকে হারিয়ে পুরো সংসারের দায়িত্ব ও ১০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। টানা দুইবার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাদ পড়লেও তৃতীয়বারে এসেছে সাফল্য। সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছেন এই তরুণ।
মোস্তাফিজুরের বাড়ি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি গ্রামে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বড় ভাই মুকুল একবুক স্বপ্ন নিয়ে ২০১০ সালে মালদ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমের টাকা বাড়িতে পাঠাতেন। সেই অর্থেই মাছের ব্যবসা শুরু করেছিলেন বাবা। পাঁচ বছরের চুক্তিতে একটি বিশাল পুকুর ইজারাও নিয়েছিলেন। তখন স্কুলের পর মোস্তাফিজুরকে বাবার মাছ চাষের সব কাজ করতে হতো। রাত হলেই দূরের নির্জন পুকুর পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত তাঁর ওপর।
কিন্তু পরপর দুটি বন্যায় পুকুরের সব মাছ ভেসে যায়, সঙ্গে ভেসে যায় পরিবারের সব স্বপ্নও। ২০১৭ সালে দীর্ঘ প্রবাস শেষে বড় ভাই যখন দেশে ফেরেন, তখন তাঁর হাতও শূন্য ছিল। তত দিনে কোনো সঞ্চয়ও আর অবশিষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাবার পেশাই বেছে নিতে বাধ্য হন তিনি। সব হতাশা আর শূন্যতার মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান মোস্তাফিজুর। বাবা তখন মাথা উঁচু করে বলতেন, ‘আমার ছেলেও একদিন বিসিএস ক্যাডার হবে।’
পরিবারটি যখন একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই আবার আঘাত আসে। বাবার লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে। বড় ভাই মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে বাবাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে নামেন মোস্তাফিজুর। সব সহায়-সম্বল উজাড় করার পরও চিকিৎসার বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে নিতে হয় মোটা অঙ্কের ঋণ। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২০২০ সালের ২৩ মে মারা যান বাবা।
২০২৪ সালে মাস্টার্স শেষ করেন মোস্তাফিজুর। টিউশনির পাশাপাশি রাত জেগে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর জন্য আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল। দুবার বিসিএসে ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয়বার যখন জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে স্ট্রোক করে মারা যান বড় ভাইও। মাথার ওপর থেকে শেষ বটবৃক্ষটাও সরে গেল। বাবা-ভাই কেউ নেই, পরিবার ও ঋণের বোঝা—মোস্তাফিজুরের আর হারানোর কিছু ছিল না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় পাওনাদারের চাপ, মায়ের কান্না, ভাবির চোখের অনিশ্চয়তা, ছোট ভাইটার অসহায়ত্ব—সব কিছু এক পাশে সরিয়ে রাখতেন তিনি।
এই একাগ্রতাই তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাবা-ভাই বেঁচে থাকলে আমার চেয়ে তাঁরাই খুশি হতেন বেশি।’ পাথরডুবি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেমের একই গ্রামে বাড়ি। তিনি মোস্তাফিজুরের বাবার সহপাঠী ছিলেন। আবুল কাশেম বলেন, ‘ছেলেটা খুব কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছে। ওদের জন্য ওদের বাবাও খুব কষ্ট করেছেন। সংসারের অনটনের কারণে ওর বাবা এসএসসিতে টেস্ট দিলেও ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে পারেননি। বড় ভাই মুকুল ক্লাস এইটের পর আর স্কুলে যায়নি। সেই পরিবার থেকে বিসিএস সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া ওদের জন্য একটা বড় আশীর্বাদ।’




