জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার, যিনি ২৬ বছর ধরে মশা বিষয়ে গবেষণা করছেন, আসন্ন আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গুর জন্য ‘বেশ ভয়াবহ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি এখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে এই দুই মাসে রোগটির প্রকোপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ড. বাশার জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (আইআরইএস) থেকে এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা হয়। এ বছর সেই মডেলের ভিত্তিতে তিনি নির্দিষ্ট কিছু জেলা চিহ্নিত করেছেন যেখানে সংক্রমণের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীসহ বরিশাল বিভাগের একাধিক জেলা, এবং বাগেরহাট ও খুলনা। এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জেও ব্যাপক আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকার প্রসঙ্গে গবেষক মন্তব্য করেন, নগরীতে সংক্রমণের সুযোগ (চান্স অব ইনফেকশন) পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পাওয়ায় অন্যান্য বছরের মতো প্রকোপ নাও দেখা যেতে পারে। তবে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় অধিকতর প্রস্তুতির ওপর তিনি জোর দেন।
মৌসুমি ঝুঁকি নিয়ে প্রচলিত ধারণা বিশ্লেষণ করে ড. বাশার বলেন, শুধু বর্ষাকালেই ডেঙ্গু হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা—বাংলাদেশে এখন সারা বছরই এ রোগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায় এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়, বিশেষ করে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সংক্রমণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
এডিস মশার অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে অধ্যাপক বাশার বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পূর্বে জানা ছিল এডিস মশা কেবল পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে এটি নোংরা পানিতেও বংশবিস্তার করছে। ৯ জুলাই একটি জাপানি গবেষক দলের সঙ্গে ঢাকায় মাঠপর্যায়ের কাজ করার সময় নোংরা পানিতে এডিস মশার প্রজনন প্রত্যক্ষ করে জাপানি বিজ্ঞানীরা বিস্মিত হন। ড. বাশারের ভাষায়, এডিস মশা অত্যন্ত চতুর এবং যেকোনো পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।
নগরবাসীর জন্য সুরক্ষার পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে মশার সার্বিক ঘনত্ব কম মনে হলেও কিউলেক্স মশার আধিক্য কমে যাওয়াই এর কারণ। এডিস মশার সংখ্যা কম হলেও একটি মশাই ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। একইসঙ্গে, বাসাবাড়ির আঙিনা, বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিং বা ফুলের টবে কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।
মশা নিধনে সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যক্রমের সমালোচনা করে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলো মূলত নর্দমা ও ড্রেনের পচা পানিতে জন্মানো কিউলেক্স মশাকে লক্ষ্য করে করা হয়, যেখানে এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হলো বাড়ির ভেতরে জমানো পানি। ফগার মেশিনের ধোঁয়া প্রয়োগকে তিনি সম্পূর্ণ অকার্যকর ও পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান যে অনেক উন্নত দেশ ইতিমধ্যে এ পদ্ধতি আইন করে নিষিদ্ধ করেছে। তবে পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড বা আইজিআর প্রয়োগকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে সুপারিশ করেন তিনি।
জরুরি করণীয় নির্ধারণ করে ড. বাশার তিনটি পদক্ষেপের কথা বলেন: জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস কার্যক্রম জোরদার করা, লার্ভা নিয়ন্ত্রণে বায়োলার্ভিসাইড বা আইজিআর প্রয়োগ করা, এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু মোকাবিলার উপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রস্তুত রাখা, যাতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।



