দামি স্কিনকেয়ারের বিপণনে 'সেনটেলা এশিয়াটিকা' নামটি চোখে পড়লে অনেকেই বিস্ময়ে ভাবেন। অথচ এই দামি উপাদানটিই আমাদের অতি পরিচিত থানকুনিপাতা। বর্ষাকালে গ্রাম-শহরের নোনা, পুকুরপাড় কিংবা খেতের আইলে অনাদরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট গোলাকার পাতাটিই এখন বিশ্ব অঙ্গনে সৌন্দর্যচর্চার এক নতুন মানে প্রতিষ্ঠা করছে।
আয়ুর্বেদ ও লো ভেষজ শাস্ত্রে বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত এই পাতা নানা আঞ্চলিক নামে পরিচিত; যেমন আদামনি, টেয়ামানিক বা ঢোলামনি। আধুনিক গবেষণাগারে এর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, প্রদাহরোধী ও কোষ পুনরুদ্ধারকারী সক্রিয় উপাদান আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর কদর বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি কোনো রোগের নিশ্চিত ওষুধ নয়; দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শই মুখ্য।
শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে থানকুনিপাতার অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়ক। অনেকে ভর্তা, সালাদ বা রান্না করে এটিকে সুষম খাবারের অংশ করেন, যা দেহের সামগ্রিক সুস্থতা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। পেটের গোলমাল ও বদহজমের মতো প্রাচীন সমস্যার ঘরোয়া সমাধান হিসেবেও এর কদর রয়েছে। এর অ্যান্টি–ব্যাকটেরিয়াল ও প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য হজমক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনুমান করা হয়।
মানসিক চাপ দূর করা ও স্মৃতিশক্তি প্রখর করতেও থানকুনি উপকারি। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, এর কিছু উদ্ভিজ্জ সক্রিয় উপাদান মস্তিষ্কের কোষগুলির কার্যকারিতা সচল রাখতে এবং মনোনিবেশ ক্ষমতা বাড়াতে মদদ করতে পারে। মানসিক চাপ লাঘব করেও এর একটি ভূমিকা থাকার প্রাথমিক প্রমাণ সামনে এসেছে, যদিও আরও পুষ্ট গবেষণা অপেক্ষমাণ।
ঋতু পরিবর্তনের সময়ে ঠান্ডা-কাশির মোকাবেলায় তুলসী, মধু অথবা গোলমরিচের সঙ্গে থানকুনিপাতার রস এক চিরাচরিত পথ্য। পারিবারিক অভিজ্ঞতায় এটি গলার অস্বস্তি কমিয়ে এনে সুরাহা দিতে পারে।
বিশ্বায়নের এই যুগে থানকুনিপাতার সর্বাধিক আলোচিত ব্যবহার হলো ত্বকের পরিচর্যায়। কে-বিউটির অত্যাধুনিক সিরাম, টোনার ও রিপেয়ারিং ক্রিমের মুখ্য উপাদান হয়ে উঠেছে এই সেনটেলা। ম্যাডেকাসাইড, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের প্রাচুর্যের কারণে এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রেখে ত্বককে শম রাখতে, ব্রণজনিত প্রদাহ হ্রাস করতে ও রোদ-ধুলোর মতো পরিবেশগত ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পটিয়। এর ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী অগণিত প্রসাধনী প্রস্তুতকারক সেনটেলার ওপর ভরসা রাখছেন।
এছাড়া গ্রামীণ জীবনপ্রণালীতে ছোটখাটো কাটাছেঁড়া বা আঁচড়ের স্থানে থানকুনি পাতা বেটে লাগানোর প্রথা চিরন্তন। এর প্রদাহবিরোধী গুণ ক্ষতস্থান শীঘ্র শুকাতে ও আরাম দিতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু গভীর কোনো আঘাত বা রক্তক্ষরণে চিকিৎসা অব্যর্থ।
পরিশেষে জেনে রাখা জরুরি, পুরোপুরি প্রাকৃতিক হলেও থানকুনিপাতা সবার জন্য সমান নিরাপদ নাও হতে পারে। অ্যালার্জির প্রবণতা বা বিশেষ কোনা জটিলতা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ব্যতিরেকে এর নিয়মিত বা অতিরিক্ত সেবন যথাযথ নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিরবচ্ছিন্ন ঘুম, শারীরিক অনুশীলন ও সুসংগত দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হিসেবে থানকুনিপাতা গ্রহণ করলে এর সম্ভাব্য উপকারিতা আরও ভালো করে পাওয়া যেতে পারে।




