ভারতের নিট-ইউজি ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে ঘিরে সৃষ্ট শিক্ষার্থী আন্দোলন শুধু সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদই ছিল না, বহু পরিবারে তৈরি করেছে গভীর আদর্শিক ফাটল। এই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরুণীকে তাদের বিজেপি বা আরএসএস সমর্থক মা-বাবার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে হয়েছে, কেউ কেউ এমনকি ঘরও ছেড়েছেন।

পাঞ্জাবের জালন্ধরের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ুয়া কুনাল চৌধুরী গত ১৪ জুলাই লুধিয়ানার বাড়ি ছেড়ে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে যোগ দেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি যুক্ত হন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়ালেও ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১২ বছরের মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এই তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভ, যার মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়।

কুনালের বাবা একজন ব্যবসায়ী এবং বিজেপি ও আরএসএসের সদস্য। বাড়ি ছাড়ার আগে কুনাল নিজেও আরএসএসের সদস্য ছিলেন। তবে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বিক্ষোভের সময়সূচির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তিনি তার শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, চারপাশের পৃথিবী ভেঙে পড়তে দেখে চুপচাপ বসে থাকা সম্ভব ছিল না। আরএসএস সম্পর্কে কুনাল বলেন, এই সংগঠন কার্যত মুসলিম ও দলিতদের ঘৃণা করতে শেখায়। তার পরিবারের আপত্তির প্রধান কারণ ছিল আন্দোলনে জাতপাত, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খেত, যা তাদের মানসিকতায় কল্পনাও করা যায় না। বিক্ষোভ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে কুনাল নিজেকে বিজেপি কর্মীর ছেলে ও সাবেক আরএসএস সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। পরে তার বাবা তাকে এই দুই সংগঠন সম্পর্কে খারাপ কথা না বলতে অনুরোধ করেন।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী প্রিয়া সিংয়ের সঙ্গে। তার বাবা বিজেপির কট্টর সমর্থক। বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা জানালে বাবা তাকে মারধরের হুমকি দেন। প্রিয়া জানান, তিনি মুখ ঢেকে বিক্ষোভে অংশ নিতেন, যাতে তার ছবি দেখে বাবা চিনতে না পারেন। বিক্ষোভের এক ভিডিওতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে নারী বিক্ষোভকারীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালাতে দেখেও তার বাবা পুলিশের পক্ষ নেন। এমনকি আহত নারীরা এরই যোগ্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রিয়া বর্তমানে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন, কিন্তু বাড়িতে গেলে তিনি তার বন্ধুদের ফোন ধরেন না বা ক্লাসের কোনো বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন না।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী অঞ্জলি (ছদ্মনাম) বলেন, তার বাবা-মা আরএসএস সদস্য এবং বিজেপির কট্টর সমর্থক, কিন্তু তিনি এখন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এআইএসএ-এর সঙ্গে যুক্ত। বিহারে বেড়ে ওঠা অঞ্জলি জানান, তার বাবা ছোটবেলায় তাকে বাজপাখির মতো নজরদারিতে রাখতেন এবং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তার প্রতি বৈষম্য করতেন। মোদির সমর্থক থেকে তিনি ধীরে ধীরে বামপন্থী রাজনীতিতে আসেন, যা তার পরিবারকে ‘লজ্জিত’ করেছে। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিপেটায় তিনি আহত হলে তার মা কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেছিলেন। তার বাবা বলেছিলেন, এই শাসনব্যবস্থা সবাইকে পিষে ফেলবে এবং অঞ্জলির মার খাওয়া ভালো লাগে কেন। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর তার মা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং এটিকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, যদিও বাবা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

যন্তর মন্তরে অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দিনই বিক্ষোভ প্রত্যাহার করে নেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কুনাল সেখানেই থেকে যান। তিনি এখন যন্তর মন্তরের কাছে একটি গুরুদুয়ারায় থাকেন এবং চুরি যাওয়া মানিব্যাগের কারণে তার কাছে কোনো টাকা নেই। তিনি একটি চাকরি খোঁজার পরিকল্পনা করছেন এবং আইন ডিগ্রি সম্পন্ন করতে দূরশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে জেএনইউর পিএইচডি গবেষক ও এআইএসএ-র কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরার বাবা-মাও বিজেপি সমর্থক। অনশনে বসেছেন জেনে তার মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলে তিনি মেয়েকে অভিনন্দন জানান। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়, জেন-জি প্রজন্মের এই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কেও নজিরবিহীন পরিবর্তন আনছে।