পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ত্বরণ ও মন্দন। আইজ্যাক নিউটনের গতিসূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তুর ওপর বাহ্যিক বল প্রযুক্ত না হলে তা স্থির থাকবে বা সরলরেখায় সমবেগে চলতে থাকবে। কিন্তু বস্তুর গতির অভিমুখে বল প্রয়োগ করা হলে তার বেগ বৃদ্ধি পায়। নির্দিষ্ট সময়ে বেগ যতটুকু বৃদ্ধি পায়, সেই বৃদ্ধির হারকে ত্বরণ বলা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি খেলনা গাড়ি প্রতি সেকেন্ডে ৫ মিটার বেগে চলছে। এর গতির অভিমুখে তিন সেকেন্ড ধরে সমান বল প্রয়োগ করলে প্রথম সেকেন্ড শেষে বেগ বেড়ে হয় ৮ মিটার প্রতি সেকেন্ড। অর্থাৎ, এক সেকেন্ডে বেগ বাড়ল ৩ মিটার। যেহেতু বল সমান, তাই দ্বিতীয় সেকেন্ডে বেগ হবে ১১ মিটার এবং তৃতীয় সেকেন্ডে ১৪ মিটার। এভাবে প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার করে বেগ বাড়ার হারই হলো ত্বরণ।
তবে সব বস্তুর গতিপথ সোজা নয়। বস্তু আঁকাবাঁকা পথে, বৃত্তাকার পথে অথবা নিজ অক্ষের চারপাশে ঘুরতে পারে। যেমন, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে এবং নিজ অক্ষের ওপর লাটিমের মতো আবর্তিত হয়। বেগ একটি ভেক্টর রাশি, তাই দিক পরিবর্তন হলেও বেগের পরিবর্তন ঘটে। ফলে গতির মান অপরিবর্তিত থাকলেও আঁকাবাঁকা পথে বা ঘূর্ণনশীল বস্তুর ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত দিক বদলানোর কারণে ত্বরণ সৃষ্টি হয়।
অপরদিকে, গতিশীল বস্তুর বেগ যদি ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে সেই হারকে মন্দন বলে। গতির বিপরীতে বল প্রয়োগ করলে বস্তুর মন্দন হয়। আগের উদাহরণে ১৪ মিটার বেগে চলা গাড়ির বিপরীতে বল প্রয়োগ করলে প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার করে বেগ কমলে তাকে ৩ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড মন্দন বলা হবে। অর্থাৎ, ত্বরণ ও মন্দন একই ধরনের ধারণা, কেবল দিক বা চিহ্ন ভিন্ন।
ত্বরণ বা মন্দনের পরিমাণ নির্ভর করে প্রযুক্ত বলের ওপর। বল যত বেশি, ত্বরণও তত বেশি। যেমন, ৩ নিউটন বল প্রয়োগে ত্বরণ ৩ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড হলে, ২ নিউটন বল প্রয়োগে ত্বরণ হবে ২ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড। বল প্রয়োগ বন্ধ করে দিলে বস্তুটি যে বেগে ছিল, সেই সমবেগে চলতে থাকে।
কিন্তু কোনো বস্তুর বেগ কি অসীম পর্যন্ত বাড়তে পারে? আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, ভরযুক্ত কোনো বস্তুর বেগ আলোর বেগের (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কোটি মিটার) সমান বা বেশি হতে পারে না। ইলেকট্রনের মতো অতি ক্ষুদ্র কণারা আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন বিশাল শক্তি। কোনো বৃহৎ বস্তুকে আলোর গতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব।
মন্দনের আরেকটি উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। ৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে চলা গাড়ির বিপরীতে ১ নিউটন বল প্রয়োগ করলে প্রতি সেকেন্ডে বেগ ১ মিটার করে কমবে। পাঁচ সেকেন্ড পর গাড়িটির বেগ শূন্য হয়ে যাবে এবং এটি থেমে যাবে। যদি বল প্রয়োগ অব্যাহত থাকে, তাহলে গাড়িটি বিপরীত দিকে চলতে শুরু করবে এবং এর বেগ ঋণাত্মক হবে, যাকে তখন ত্বরণ বলা হবে। কারণ, ঋণাত্মক মন্দনই হলো ত্বরণ।
ত্বরণ বা মন্দন সব সময় সুষম নাও হতে পারে। প্রযুক্ত বলের পরিবর্তনের সাথে সাথে ত্বরণের মানও পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন, প্রথম সেকেন্ডে ২ নিউটন বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ ২ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড, দ্বিতীয় সেকেন্ডে ৩ নিউটন বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ ৩ মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড হতে পারে। এভাবেই বেগ ও ত্বরণ উভয়ই পরিবর্তনশীল হতে পারে।
গাণিতিকভাবে, প্রথম সমীকরণ v = u + at, যেখানে v শেষ বেগ, u আদিবেগ, a ত্বরণ এবং t সময়। এই সমীকরণ থেকে ত্বরণের সূত্র দাঁড়ায় a = (v - u) / t। স্থির অবস্থা থেকে শুরু হলে আদিবেগ শূন্য হয়, তাই a = v / t। আর বেগ হ্রাস পেলে মন্দনের সূত্র হবে a = (u - v) / t। ত্বরণের একক মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড (ms⁻²), কারণ বেগের একক (ms⁻¹) কে সময় (s) দিয়ে ভাগ করলে এই একক পাওয়া যায়।




