দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা পরিষেবায় মারাত্মক ঘাটতির চিত্র প্রকাশ পেল এক নতুন গবেষণায়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো রেডিও ইমেজিং যন্ত্র থাকা সত্ত্বেও বিগত এক বছরে এসব সরঞ্জামের ৫২ শতাংশই কোনো কাজে লাগেনি। বুধবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ৯ মাস ধরে আট বিভাগের ২২টি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে এই গবেষণা চালানো হয়। হোসেন জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে গবেষক দলটি উপজেলা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য পর্যালোচনা করে। জেলা হাসপাতালগুলোয় ৮৫ শতাংশ ইমেজিং সেবা থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে। উপজেলা পর্যায়ে এই হার ৪৬ থেকে ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে, আর টারশিয়ারি হাসপাতালে ৫৪ থেকে ২৫ শতাংশে।
সেবা বিঘ্নিত হওয়ার প্রধান চিহ্নিত হয়েছে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে থাকা। ৭৯% ক্ষেত্রেই এই কারণ দেখানো হয়েছে। এর বাইরে ১৪% ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং ৭% ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট না থাকার তথ্য দিয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা। উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি টেকনোলজিস্ট পদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই এখনও অপূর্ণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্যতার হার ২৭ শতাংশ, আর বিশেষায়িত ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এটি ৩৬ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নীতিগত পরিকল্পনার অভাবে অতি দামি অনেক যন্ত্র বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। তিনি পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অপরিকল্পিত ক্রয়কে জনগণের অর্থের অপচয় হিসেবে অভিহিত করে চিকিৎসকদের ক্লিনিক নির্ভর মনোভাবেরও সমালোচনা করেন।
ওষুধের মজুত নিয়েও জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি ওষুধের প্রাপ্যতা গড়ে মাত্র ২২ শতাংশ। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে এই মজুত মাত্র ১২ শতাংশ, যা পরিস্থিতিকে আরও সঙ্গিন করে তুলেছে। সরবরাহের ৩৩ শতাংশ ওষুধই সরকারি ইডিসিএলের বাইরের উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
ল্যাব সেবার ক্ষেত্রেও টারশিয়ারি লেভেলে বড় ধরনের তফাত পাওয়া গেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ৮১ থেকে ৮৯ শতাংশ ল্যাব পরীক্ষা চালু থাকলেও মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত কেন্দ্রে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩ থেকে ৪৫ শতাংশে। রিএজেন্টের ঘাটতি ও নষ্ট যন্ত্রই এর মূল কারণ। জরুরী সরঞ্জাম, যেমন টুর্নিকেট বা নবজাতকের ক্ল্যাম্প, অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত।
হোসেন জিল্লুর রহমান বাজেট বরাদ্দ নয়, বরং সেই অর্থ কার্যকরী সেবায় রূপান্তরিত করার সক্ষমতাকে মূল চ্যালেঞ্জ বলে অভিহিত করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ ব্যয় করলেও সাধারণ সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। তিনি মেডিকেল টেকনোলজিস্টের শূন্য পেশে দ্রুত নিয়োগ, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করেন। দীর্ঘমেয়াদে ইডিসিএল-এর আধুনিকায়ন ও কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের বিতরণব্যবস্থা কার্যকর করার পরামর্শ দেওয়া হয়।




