কাতারভিত্তিক টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ওরেডু গ্রুপ বহু বিলিয়ন ডলারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো বাজারের সুযোগ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই লক্ষ্যে তারা ইন্দোনেশিয়ার প্রথম নিবেদিত এআই কম্পিউট ও নিওক্লাউড প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলছে, যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃহৎ পরিসরে এআই মডেল তৈরি, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার সুযোগ করে দেবে।
এনভিডিয়া, নকিয়া এবং ইন্দোসাত ওরেডু হাচিসন (আইওএইচ)-এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মটির নাম রাখা হয়েছে 'জান্কোর'। সুপারকম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগামী তিন বছরের মধ্যে ১ গিগাওয়াট (জিডব্লিউ) এআই কম্পিউটিং ক্ষমতা চুক্তিবদ্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যেই ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের জন্য পরিকল্পিত প্রায় ২০০ মেগাওয়াট এআই ক্ষমতার জন্য ব্লু-চিপ গ্রাহক নিশ্চিত করেছে জানকোর।
এ থেকে পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে আনুমানিক ১৩ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব এবং ৯ বিলিয়ন ডলার সঞ্চিত ইবিটডা (সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধের পূর্বে আয়) জেনারেট হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর আনুপাতিক ইবিটডা অবদান ওুদেডু গ্রুপের জন্য প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার হবে বলে ধরা হচ্ছে। জাঙ্কোর-এর ৪৯% শেয়ার নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ও প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে ওকেডো গ্রুপ প্রাথমিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আজিজ আলুথমান ফাখরু একটি সাক্ষাৎকারে জানান, তারা গত ৩৬ মাস ধরে ঐতিহ্যবাহী টেলিকম কোম্পানি থেকে শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কৌশল গ্রহণ করেছেন। জানকোর হচ্ছে সেই বিবর্তনের সর্বশেষ সংযোজন। দুই বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান আইওএইচ-এর মাধ্যমে এনভিডিয়ার প্রথম ক্লাউড পার্টনার হওয়ার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ওখেডু, যা বর্তমানের অনেক বড় পরিসরের প্রস্তাবনার পরখকে সহজ করে দিয়েছে।
জানকোর-এর নিওক্লাউড প্ল্যাটফর্মটিতে থাকবে জিপিইউ-অ্যাজ-সার্ভিস, একটি ক্লাউড কম্পিউটিং মডেল যেখানে ব্যবহারকারীরা ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার কেনার পরিবর্তে উচ্চ-কার্যক্ষমতা সম্পন্ন গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) ভাড়া নিতে পারবেন। একটি অর্কেস্ট্রেশন স্তর নির্ধারণ করবে কীভাবে জিপিইউ ক্ষমতা একাধিক ব্যবহারকারীর মধ্যে ভাগ হবে এবং এনভিডিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো জিপিইউ ফ্লিটের মধ্যে অপরিত্যক্ত শক্তি পুনরুদ্ধার করবে। এর ফলে ৪০% পর্যন্ত বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা তৈরি হবে।
ফখরু জানান, এনভিডিয়া নিজেদের কম্পিউট ও এআই দক্ষতা এবং সাধারণ স্থাপত্য নিয়ে আসছে, আর নকিয়া আনছে তাদের নেটওয়ার্কিং অভিজ্ঞতা। ২০২২ সালে ইন্দোসাত ওরেডু ও হাচিসন এশিয়া টেলিকম গ্রুপের ৬ বিলিয়ন ডলারের একীভূতকরণের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল টেলিকম কোম্পানি আইওএইচ গঠিত হয়। ওডু ২০০৮ সালে ১.৮ বিলিয়ন ডলারে ইন্দোসাতের ৬৫% স্টক অধিগ্রহণ করে। এই সর্বশেষ বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল ডাটা সেন্টার বাজারে ওরেডুর অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ এআই কম্পিউট ও ক্লাউড শিল্পে সুযোগ কাজে লাগানোর সুযোগ দেবে।
কে,পিএমজি-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং আগামী কয়েক বছরে এআই-প্রস্তুত ডেটা সেন্টারের চাহিদা আরও জোরালো হবে। বিশাল ভূখণ্ড, তরুণ ও ডিজিটালি দক্ষ জনসংখ্যা, সম্পদে সমৃদ্ধ, ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থান এবং অগ্রগামী নিয়ম-নীতির জন্য ইন্দোনেশিয়াকে এশিয়ায় কাজ করার জন্য একটি 'দুর্দান্ত ভিত্তি' হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফখরু।
তিনি উল্লেখ করেন যে ম্যাককিঞ্জির এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এআই গ্রহণের গতি বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও দ্রুততর। অন্যদিকে, উড ম্যাকেঞ্জির তথ্যমতে, এআই কাজের চাপ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং ক্লাউড গ্রহণের কারণে এশিয়ার এই অঞ্চলে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ২০২৫ সালের ২.৬ জিওয়াট থেকে ২০৩৫ সালে ১০.৭ গিগাওয়াটে চারগুণ হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। ফরুর জন্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং থাইল্যান্ডের মতো বাজার থেকে ভবিষ্যৎ চাহিদা দেখছেন।
প্রাথমিক পরিকল্পিত ২০০ মেগাওয়াট কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা এর চেয়েও বেশি বলে জানিয়ে সিইও বলেন, এটি তাদের এমন অবস্থায় ফেলেছে যেখানে তারা সুনাম ও বান্ডশিটের ভিত্তিতে ভাড়াটে বেছে নিচ্ছেন। শীর্ষস্থানীয় গ্রাহকদের সাথে বহু-শত মিলিয়ন ডলারের চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন যে এটি অত্যন্ত উচ্চ-মূল্যবান প্রস্তাবনা। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে চাহিদা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি, তবে আগামী পাঁচ বছরে ভারসাম্য এলে দক্ষতার সাথে সুবিধা প্রদানই প্রতিযোগিতার মূল নির্ধারক হবে।
ইতোমধ্যে জাকার্তা দেশটির প্রধান ক্লাউড ও হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত পেয়েছে। সম্প্রতি ইওএইচ-এর এআই ক্লাউড সেবা ২৮ মেগাওয়াট জিপিইউ ক্ষমতার মালিকানা ও পরিচালনা করবে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির নিওক্লাউড ব্যবসা ৩৩ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব নিয়ে এসেছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের ২৮ মিলিয়নকে ছাড়িয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, প্রতিযোগিতামূলক উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজারে গত কয়েক বছরে মেনা অঞ্চলে ডেটা সেন্টার অবকাঠামো নির্মাণের উচ্চাকাঙক্ষাও জোরদার করছি ও ডু। ২০২৪ সালের জুনে তারা কাতার, কুয়েত ও ওমান সহ ২৬টি ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার এনভিডিয়ার জিপিইউ স্থাপনের চুক্তি করে। মেনা ডিজিটাল হাবকে পরবর্তীকালে আয়রন মাউন্টেনের বিনিয়োগের পর সিনটিস নামে পুনর্নামকরণ করা হয়। ফরু জানান, ২০২৪ সালে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২০ মেগাওয়াটের বেশি ডেটা সেন্টার ক্ষমতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, তারা তার চেয়েও এগিয়ে থাকবেন।
কোম্পানিটির নিট ঋণ-থেকে-ইবিটিডিএ অনুপাত এখন ০.৬এক্স, যা বোর্ডের নির্দেশনা ১.৫ থেকে ২.৫-এর তুলনায় অনেক নিচে। এতে তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা অনেক বাড়িয়েছে। ফখরু জানান যে তারা একইসাথে পাঁচ থেকে দশটি সুযোগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং জৈবিক বব্ধির পথকেই অগ্রাধিকার দেন, কারণ এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য উচ্চতর মুনাফা দেখা যায়। তবে তারা এ বিষয়ে অত্যন্ত অনুশাসিত। জানকোরের ক্ষেত্রে সব শর্তই পূরণ হয়েছে।


