বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। শনিবার সিলেটে অবস্থানকালে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেন।

তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসা মার্কিন দূত গত শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘তাঁরা ইন্ডিয়ায় বসেও তো কথা বলতে পারেন। তিনি তো ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রদূত। এখানে এসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎটা যদি নিছকই সৌজন্য মোলাকাত হয়ে থাকে, তবে সেটা স্বতন্ত্র বিষয়। কিন্তু যদি দুই দেশের কোনো ইস্যু আলোচিত হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে তা বাংলাদেশ সরকার অথবা বিরোধী দলের সঙ্গে হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের কূটনীতিকের সঙ্গে এমন বৈঠক আমরা সমীচীন মনে করি না।’

শফিকুর রহমান স্থানীয় পত্রিকা ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এর ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সুধী সম্মিলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে সিলেটে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নানা সমসাময়িক ইস্যুতেও বক্তব্য তুলে ধরেন।

তিনি নির্বাচন কমিশনের পদায়ন নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ‘সরকার কিছু তৎপরতা শুরু করেছে, যাতে আমরা উদ্বিগ্ন। একজন খাস দলীয় লোক, যিনি পাঁচ-সাত বছর আগে অবসর নিয়েছিলেন, তাঁকে নির্বাচন কমিশনে উপসচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অতীতের যে নির্বাচনকাল, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে এটা দেখে আমরা স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত। পুনরায় যদি এমন পাঁয়তারা চলে, তাহলে নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে গোটা জাতির মাঝে সংশয় তৈরি হবে। এমন নির্বাচনের কৌশল জাতি বরদাস্ত করবে না, আমরাও করব না।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে দায়িত্ব কর্তব্যে সচেতন হওয়ার ডাক দিয়ে জামায়াত আমির বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সারা দেশের। তাঁকে দায়িত্ব নিতে হবে, স্বীকারকারিতা বন্ধ করতে হবে, চাঁদাবাজি থামাতে হবে। স্পিকার স্বয়ং বলেছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না করতে পারলে জাতির কপালে ভবিষ্যতে বড় দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। আমাদের দেশ আবার চোরাবালি ও অন্ধকার গলিতে তলিয়ে যাক, এটা আমরা কোনোভাবেই প্রত্যাশা করি না।’ তারেক রহমান একই সাথে সরকার ও দলের প্রধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও তাঁর দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

গণভোট ইস্যুতে বিএনপি তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, ‘সবাই একসময় গণভোটের স্বপক্ষে মত দিয়েছিল, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ট পাওয়ার পর তারা ভাবলো, এখন যা খুশি তাই বাস্তবায়ন করা যাবে। ফলে এখন আর গণভোট মানতে তাদের আপত্তি, কারণ এতে তাদের জটিলতা হবে। জনগণের রায় ও ভোটকে অসম্মান করলে কী পরিণাম ডেকে আনে, তা এই দেশের ইতিহাস বলে, বিশ্ব ইতিহাসও বলে। এর পরিণতি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হতে পারে।’

সিলেটের বন্দরবাজার এলাকার কুদরত উল্লাহ মসজিদ মার্কেটে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যে তিনি দেশের বিদ্যমান আস্থার সংকটকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ‘এই আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা ছাড়া আমরা জাতি হিসেবে মর্যাদায়ী হতে পারব না। পৃথিবীতে যে দেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে প্রসস্ত, তারাই সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। যে জাতির পাসপোর্টধারী মানুষ বিনা ভিসায় সর্বোচ্চ সংখ্যক দেশে ভ্রমণ করতে পারেন, তাঁরাই প্রকৃত সম্মানিত। আমাদের অবস্থান সেই তুলনায় খুবই নাজুক।’

দৈনিক জালালাবাদ-এর সম্পাদক এবং সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে আরও বক্তব্য রাখেন সিলেটস্থ ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব রাজেশ ভাটিয়া, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আব্দুর রব, বিএনপির মহানগর সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান প্রমুখ।