রাজধানীর মতিঝিল ও কমলাপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসা তানিম রেজা ওরফে বাপ্পির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে পরিচয় বদলের তথ্য মিলেছে পুলিশের তদন্তে। দক্ষিণ কমলাপুরে কোরবানির পশুর হাটের ইজারাদার ইসমাইল হোসেনের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না পেয়ে গত ১৯ মে তাঁর প্রতিষ্ঠান 'এআই কার্গো সার্ভিস'-এ প্রকাশ্যে গুলি চালায় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হলে তদন্তে তানিমের নাম উঠে আসে।প্রায় দুই মাসের চেষ্টায় গত ১৭ জুলাই সকালে রাজধানীর পূর্বাণী হোটেল এলাকা থেকে তানিমকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির মতিঝিল অঞ্চলের একটি দল। পরে তাঁর সহযোগী রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজন, মোহাম্মদ জুয়েল, শাকিল ও মানিক কাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইস্টার্ন কমলাপুর হাউজিংয়ের একটি ফ্ল্যাট থেকে তিনটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, একটি ইলেকট্রিক শক গান ও একটি কুড়াল উদ্ধার করা হয়।পুলিশের ভাষ্য, ২০০২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের সহযোগী হিসেবে মতিঝিলে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন তানিম। জিসান বর্তমানে দুবাইয়ে পলাতক। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতাদের হয়ে দরপত্র নিয়ন্ত্রণে কাজ করতেন তিনি। ঠিকাদারদের অস্ত্রের ভয় দেখানো, চাঁদা আদায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দরপত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর কাজ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতার ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন তানিম। এরপর নিজেকে যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর এলাকায় নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন।ডিএমপি মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, মতিঝিল, মগবাজার, মালিবাগ, কমলাপুরসহ আশপাশের এলাকায় গুলি, চাঁদাবাজি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে কাজ করার নানা ঘটনায় তানিমের নাম এসেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নিজস্ব শুটার বাহিনী দিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ভয় দেখাতেন তিনি। সাত থেকে নয়জনের একটি অস্ত্রধারী দল সব সময় তাঁর সঙ্গে থাকত। তানিম নিজেও নিয়মিত অস্ত্র বহন করতেন।তদন্তে আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মতিঝিল এলাকায় ময়লা-বাণিজ্য, ফুটপাত, ফ্ল্যাট, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সম্পৃক্ত ছিলেন তানিম। সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন পলাতক ব্যক্তির ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও তিনি নেন। কমলাপুরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্সপ্রেস বাস কাউন্টার থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া এবং ঢাকা–কুমিল্লা রুটে চলাচলকারী রয়েল কোচ পরিবহনের শেয়ারের একটি অংশ দখলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। মতিঝিল থানা বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীকেও ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তাঁর নাম এসেছে।পুলিশ জানায়, তানিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দস্যুতা, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে সাতটি মামলা আগে থেকে আছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে রাজধানীর রামপুরা, হাতিরঝিল, খিলগাঁও, শ্যামপুর ও ডেমরা থানায় এসব মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৩ সালে মালিবাগের সানরাইজ আবাসিক হোটেলে অভিযানের সময় গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নুরুল আলম শিকদার ও উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইখতিয়ার ও জিসানের পাশাপাশি তানিমের নামও এসেছিল। ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনের করা মামলায় তানিম ও রাকিবুলকে সাত দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। অস্ত্র উদ্ধারের পর তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মতিঝিল থানায় আরেকটি মামলা করা হয়েছে। সহযোগী লিখন, জাহিদ হাসান, আদর ও জিতুকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।