রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার গোবরা গ্রামটি এখন ‘গাভির গ্রাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই এখন গাভির খামার, হাঁস-মুরগি, মাছের পুকুর আর সবজির আবাদ চোখে পড়ে। গ্রামটির এই রূপান্তরের মূল কারিগর সিরাজুল ইসলাম নামের এক উদ্যোক্তা।
১৯৮৩ সালে জন্ম নেওয়া সিরাজুল তিন ভাইবোনের মধ্যে বড়। বাবা ফজলুর রহমান ব্যবসায়ী ছিলেন। লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করার পর ২০১৩ সালে কাউনিয়া উপজেলার শাহবাগ গ্রামের একটি সফল খামার পরিদর্শনে যান তিনি। সেখানে আবদুর রহমান নামের এক খামারির সংগ্রামের গল্প তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর কাছ থেকেই গাভি ও ছাগল পালনের নানা কৌশল শেখেন সিরাজুল।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাবার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে বাড়ির পাশে একটি ছোট গাভির খামার গড়ে তোলেন তিনি। প্রথম দিকে গাভির রোগ, খাদ্যের দাম ও পরিচর্যা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তবে মাত্র ১০ মাসের মধ্যে চারটি গাভি দুধ দেওয়া শুরু করে। প্রথম বছরেই দুধ ও বাছুর বিক্রি করে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় করেন সিরাজুল। সেই লাভ পুরোটাই খামারে পুনর্বিনিয়োগ করেন তিনি।
বর্তমানে সিরাজুলের খামারে দেশি-বিদেশি জাত মিলিয়ে ২৬টি গাভি রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। দুধ ও বাছুর বিক্রি করে মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। এর বাইরে ৩০ শতক জমির পুকুরে মাছ চাষ, ২০০টি মুরগি ও ২০টি ছাগল পালন করছেন। এসব থেকে বছরে বাড়তি দুই লাখ টাকা আসে। এ আয় দিয়ে তিনি পাকা বাড়ি নির্মাণ, জমি ক্রয়, মোটরসাইকেল কেনা, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন এবং ফলদ গাছ ও সবজির বাগান তৈরি করেছেন।
সিরাজুলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো অন্যদের উদ্বুদ্ধ করা। তাঁর পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় গ্রামের বহু তরুণ খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এইচএসসি পাসের পর চার বছর বেকার থাকা জিকরুল হক ২০২০ সালে তিনটি বিদেশি জাতের গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন। এখন তাঁর দৈনিক আয় প্রায় এক হাজার টাকা। তিনি পাকা বাড়ি করেছেন ও ৪০ শতক জমি কিনেছেন। মোস্তাফিজার রহমান চার বছর আগে তিনটি গাভি দিয়ে শুরু করে এখন ১৪টি গাভির মালিক। দুধ বিক্রি করে মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি বলেন, ‘সিরাজুল ভাইকে দেখে সাহস পেয়েছিলাম।’
ভবিষ্যতে ২০০টি গরুর একটি আধুনিক খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন সিরাজুল। মাছের পুকুরের ওপর মাচা তৈরি করে হাঁস-মুরগি পালনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিসিএস বা অন্য চাকরির পরীক্ষার পেছনে যে সময় ব্যয় হয়, তা যদি নির্দিষ্ট কাজে লাগানো যেত, তবে চাকরির চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব। দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় চাকরির সুযোগ এক শতাংশেরও কম। তাই তরুণদের উদ্যোক্তা হতে হবে, শুধু চাকরির আশায় বসে না থেকে নিজে কিছু করার চেষ্টা করতে হবে।
অন্নদা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, চাকরির পেছনে না ছুটে খামার গড়ে সিরাজুল যে সাফল্য এনেছে, তা অবিশ্বাস্য। তাঁর পথ অনুসরণ করে অনেক বাড়ি এখন খামারে পরিণত হয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা একরামুল হক বলেন, লেখাপড়া শেষ করে সবাই চাকরির পেছনে ছোটে, কিন্তু ইচ্ছা থাকলে খামার করেও নিজের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। সিরাজুল তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে সব সময় তাঁকে সহযোগিতা করা হয় বলে জানান তিনি।



